পাওয়ারলিফটিং ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে বিজয়ী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন শাম্মী নাসরিন। পঞ্চাশোর্ধ্ব এই নারী ইতিমধ্যে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে এশিয়ার মঞ্চে স্বর্ণপদক জিতে ইতিহাস গড়েছেন। ৫৪ বছর বয়সে নিয়মিত জিমে অনুশীলন করেন, প্রতিযোগিতায় ১২০ কেজি বা তারও বেশি ওজন তুলতে সক্ষম। সংসারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি এখন মিরপুরের একটি ফিটনেস সেন্টারে প্রশিক্ষক হিসেবেও কাজ করছেন।
এই যাত্রার শুরুটা হয়েছিল একেবারে ভিন্ন কারণে। শরীরে ডায়াবেটিসসহ নানা অসুস্থতা কড়া নাড়ছিল। সুস্থ থাকার তাগিদে বড় ছেলে তানভীর ফয়সলের সঙ্গে জিমে যেতে শুরু করেন। ছেলের বন্ধুরা যেমন ব্যায়াম করতেন, তেমনি কিছুটা করার চেষ্টা করতেন তিনিও। ওজন তোলার ক্ষমতা দেখে বুঝতে পারেন, এই পথে এগোনো সম্ভব। ছেলে একসময় জিম ছেড়ে দিলেও তিনি থামেননি। ২০১৯ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পাওয়ারলিফটিং শুরু করেন তিনি। অথচ এর আগে খেলাধুলার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্কই ছিল না।
বাংলাদেশে এই খেলার গোড়াপত্তন হয় ২০১৮ সালে বাংলাদেশ পাওয়ারলিফটিং অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা ও মহাসচিব মোমিনুল হকের হাত ধরে। পরের বছরই শাম্মীর পথচলা শুরু। ২০২০ সালের জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে তাঁকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে অ্যাসোসিয়েশন অন্য নারীদের উৎসাহিত করেছিল। তখন বয়সভিত্তিক আলাদা বিভাগ না থাকায় তাঁকে ওপেন ক্যাটাগরিতে লড়তে হতো।
এরপর একে একে সাফল্য এসেছে। তিনবার জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি এশিয়ান পর্যায়ে জিতেছেন তিনটি স্বর্ণ ও দুটি ব্রোঞ্জপদক। জাতীয় পর্যায়ে গড়েছেন নয়টি রেকর্ড। ২০২৩ সালে প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পদক জেতেন তিনি। এশিয়ান পাওয়ারলিফটিং চ্যাম্পিয়নশিপে ‘উইমেন মাস্টার–১ অনূর্ধ্ব-৬৩’ ক্যাটাগরির স্কোয়াটে ব্রোঞ্জ জিতে ইতিহাস রচনা করেন। ২০২৫ সালে ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত এশিয়ান ওপেন অ্যান্ড মাস্টার্স ক্ল্যাসিক চ্যাম্পিয়নশিপে ৬৩ কেজি মাস্টার-২ বিভাগে প্রথম হন। স্কোয়াট, বেঞ্চ প্রেস ও ডেডলিফট—তিন লিফটে ৫০ থেকে ৬০ বছর বয়সী এশীয় নারী পাওয়ারলিফটারদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মোট ৩২২ দশমিক ৫ কেজি ওজন তুলে তিনটি স্বর্ণ ও একটি ব্রোঞ্জপদক অর্জন করেন।
জিমে যাওয়ার পর ডায়াবেটিসের সমস্যা অনেকটা কমে আসে। শরীরে বড় কোনো অসুস্থতাও নেই। ওজন প্রায় ৬৩ কেজির আশেপাশে। খাবারের তালিকায় সেদ্ধ শাকসবজি, মুরগির বুকের মাংস, লাল চালের অল্প ভাত। কোনো কোনো দিন ১০টি ডিমও খেতে হয়। তাঁর মতে, নিয়মিত অনুশীলন, খাদ্যাভ্যাসে শৃঙ্খলা ও নিজের ওপর বিশ্বাসই শক্তির মূল।
দুই ছেলে, তাঁদের স্ত্রী, চার বছরের নাতি, এক মেয়ে ও স্বামী শামসুল হককে নিয়ে তাঁর সংসার। মাত্র ১৫ বছর বয়সে পরিবারের অমতে মাধ্যমিক পাসের পর এই বিয়ে হয়েছিল। দুই পরিবারই তখন মেনে নেয়নি। এমন দিনও গেছে যখন একটি বাটার বান দুজনে ভাগ করে খেয়ে দিন কাটিয়েছেন। এখন সেই স্বামীই তাঁর বড় সমর্থক। শুরুতে সামান্য আপত্তি থাকলেও এখন যতটুকু সম্ভব পাশে থাকার চেষ্টা করেন। বাসায় চারটি ডিম থাকলে তা স্ত্রীর জন্য তুলে রাখেন, কারণ খাদ্যতালিকায় ডিমের গুরুত্ব তিনি জানেন। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার খরচও স্বামীর মাধ্যমে ব্যবস্থা হয়।
মেয়ে হৃদিশা মৌরিন এ লেভেল শেষ করেছেন। মায়ের কাজ নিয়ে গর্বিত তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ বাজে মন্তব্য করলে খারাপ লাগে, তবে সেগুলো উপেক্ষা করেন। ড্রয়িংরুমে ছেলের অর্জনের স্মারক ও মায়ের পদকগুলো পাশাপাশি রাখা—যেন পরিবারের সংগ্রামের গল্পই বলে।
ছেলের বিয়ের দিনও প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার ঘটনা তাঁর জেদকে ফুটিয়ে তোলে। কোয়ালিফাই রাউন্ড ও বিয়ের তারিখ একই দিনে পড়েছিল। হল বুকিংসহ সব ঠিক। অ্যাসোসিয়েশনের কর্তাব্যক্তিরা সকালে খেলার ব্যবস্থা করে দেন। আগের রাতে মেহমানদের খাবার রান্না করেন। ঘুম হয়নি। সকালে খেলা শেষ হতে হতে দুপুর দুইটা বেজে যায়। তারপর বেডশিট কিনে পারলারে গিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছান। সেখানে সবার আগে উপস্থিত হতে পেরেছিলেন তিনি। স্বামীকেও জিমে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, যদিও এক সপ্তাহের বেশি টেকেনি।
রায়হান ফিটনেসে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন শাম্মী। সেখানে কেউ ‘আপা’, কেউ ‘আন্টি’ বলে ডাকেন। প্রশিক্ষক নাইরুজ সুবহা বলেন, “তিনি আমাদের আদর্শ। এই বয়সে যা পারেন, আমরা তা পারি না। তাঁর ইতিবাচক শক্তি দেখে ছেলেরাও উৎসাহিত হন।” জিমে নির্দিষ্ট পোশাকে দ্রুত প্রস্তুত হয়ে পাওয়ারলিফটিং জোনে যান। বারবেলের পাশে প্লেট যোগ হয়। অনায়াস ভঙ্গিতে ১২০ কেজি বা তার বেশি ওজন তুলে ফেলেন। নতুনদের চোখে বিস্ময় থাকলেও তাঁর কাছে এটি এখন স্বাভাবিক।
পাওয়ারলিফটিং হলো শক্তির খেলা, যা তিনটি লিফটে সর্বোচ্চ ওজনের তিনটি প্রচেষ্টার মাধ্যমে গঠিত। স্কোয়াটে ঘাড়ে, বেঞ্চ প্রেসে শুয়ে বুকে এবং ডেডলিফটে মাটি থেকে ওজন তুলতে হয়। এই তিন লিফটের সর্বোচ্চ ওজনের ভিত্তিতে ফল নির্ধারিত হয়। তবে এই খেলার পেছনে খরচও কম নয়। বিশেষ বেল্ট, জুতা ও সরঞ্জামের দাম বেশি। প্রতিদিনের খাবার ও আন্তর্জাতিক ভ্রমণে বিপুল অর্থ লাগে। বাংলাদেশ পাওয়ারলিফটিং অ্যাসোসিয়েশন এখনো সরকারি অনুমোদন পায়নি। আলাদা জিম বা অফিস নেই। খেলোয়াড়দের আর্থিক সহায়তাও দিতে পারে না সংগঠনটি। তবু নারীদের অংশগ্রহণে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিছু প্রতিযোগিতায় ৪০ থেকে ৪৫ জন নারী অংশ নেন, যদিও ঝরে পড়ার হার বেশি।
মোমিনুল হক বলেন, “শাম্মী ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য যেভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাতে সবাই আশাবাদী। তাঁর হাত ধরেই বাংলাদেশ নতুন রেকর্ড গড়তে পারে।” তাঁর ভাষায়, যে বয়সে নারীরা মনে করেন সব শেষ, সেই বয়সেই শাম্মী জীবনকে নতুনভাবে শুরু করেছেন। আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের খরচে পদক আনা প্রথম নারী খেলোয়াড় তিনি। খেলাধুলার পাশাপাশি চাকরিও করছেন। স্বামী প্রায়ই খাবার নিয়ে পাশে বসে থাকেন।
শাম্মীর সামনে এখন একটাই লক্ষ্য—বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে জয়। সুস্থ থাকলে ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত খেলার ইচ্ছা আছে। থামতে চান না তিনি। সবার উদ্দেশে তাঁর বার্তা, সুস্থ থাকার জন্য হলেও জিমে যাওয়া উচিত। পাওয়ারলিফটিং করতে নিজেকে ভালোবাসতে হবে, নিয়ম মেনে চলতে হবে, মনোবল ও সাহস থাকতে হবে। সন্ধ্যায় জিম থেকে ফিরে আবার সংসারের দায়িত্ব—রান্না, পরিবার, নাতি। শুধু স্বপ্নটা এখন আর আগের মতো নয়। ৫৪ বছর বয়সে নতুন আত্মবিশ্বাস নিয়ে তিনি তাকিয়ে আছেন বিশ্ব মঞ্চের দিকে।




