ডারউইনের টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং বিপর্যয়ের মাঝে একের পর এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। দ্বিতীয় ইনিংসের একাদশ ওভারে হাসান মাহমুদের অফ স্টাম্পের বাইরের বল টেনে স্টাম্পে এনে বোল্ড হন ট্রাভিস হেড। কিন্তু আউট হয়ে ড্রেসিংরুমে ফেরার পথে যা ঘটল, তা ক্রিকেটের ইতিহাসে বিরল। মাটিতে পড়ে থাকা বেলসটি হাতে তুলে স্টাম্পের শীর্ষে আবার বসিয়ে দিলেন অস্ট্রেলীয় ওপেনার। এরপর শান্তভাবে হাঁটা ধরলেন প্যাভিলিয়নের দিকে। এমন দৃশ্য সাধারণত দেখা যায় না; বরং আউট হয়ে ব্যাটসম্যানরা ক্ষোভে স্টাম্প ভেঙে ফেলেন বা ব্যাট ছুড়ে মারেন।

ফক্স ক্রিকেটের ধারাভাষ্যকার অ্যাডাম গিলক্রিস্ট সঙ্গে সঙ্গেই বলেন, তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারে এমন ঘটনা কখনো দেখেননি। তিনি বলেন, “অবিশ্বাস্য দৃশ্য! আমার ক্রিকেট ক্যারিয়ারে কখনো এমন দেখিনি। একজন ব্যাটসম্যান এতটাই হতাশ যে সে নিজেই ভেঙে পড়া স্টাম্প আবার ঠিক করল!” অস্ট্রেলিয়ার আরেক সাবেক ওপেনার মার্ক ওয়াহও একইভাবে মন্তব্য করেন। তাঁর ভাষায়, অধিকাংশ ব্যাটসম্যান আউট হয়ে ক্ষোভে স্টাম্প ভেঙে ফেলেন, কিন্তু হেড করেছেন ঠিক উল্টো—নিজ হাতে বেলস তুলে বসিয়েছেন।

এই আচরণকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মনোবিজ্ঞানের দিকটি সামনে আসে। সুইস-আমেরিকান মনোবিদ এলিজাবেথ কুবলার-রসের ‘অন ডেথ অ্যান্ড ডাইং’ গ্রন্থে উল্লেখিত দুঃখের পাঁচটি স্তর—অস্বীকার, ক্ষোভ, দর কষাকষি, বিষণ্নতা ও মেনে নেওয়া—হেডের ক্ষেত্রে যেন দুটি ইনিংসজুড়েই প্রতিফলিত হয়েছে। প্রথম ইনিংসে হাসান মাহমুদের বলেই বোল্ড হয়ে মাথা নাড়ানোর মাধ্যমে তাঁর ক্ষোভ ও অস্বীকারের প্রকাশ ঘটেছিল। দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৫ বলে ১৭ রান করার সময় তিনটি চার মারলেও তিনি স্বস্তিতে ছিলেন না; এটি যেন দর কষাকষির পর্যায়। বেলস পড়ার শব্দ শুনে বিষণ্নতা গভীর হয়েছিল, আর শেষ পর্যন্ত স্টাম্প ঠিক করে ফিরে যাওয়া ছিল মেনে নেওয়ার চূড়ান্ত প্রকাশ। ফলে দুই ইনিংস মিলিয়ে দুঃখের পাঁচটি স্তরই পাড়ি দিতে হলো হেডকে।

একই ম্যাচে আরেক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে চতুর্দশ ওভারে। ইবাদত হোসেনের প্রথম বলে লিটন দাসের ক্যাচের আবেদনে আম্পায়ার কুমার ধর্মসেনা আঙুল তোলার আগেই স্টিভ স্মিথ রিভিউয়ের আবেদন করেন। ধারাভাষ্যকার কেরি ও’কিফ একে টেস্ট ক্রিকেটের অভিনব মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেন—যেখানে আম্পায়ারের সিদ্ধান্তের আগেই ব্যাটসম্যান রিভিউ চেয়েছেন। বাংলাদেশের সমর্থকদের চোখে বিষয়টি ভিন্নরকম। দ্বিতীয় ইনিংসে ২২৮ রানে পিছিয়ে থেকে ৪০ রানে ২ উইকেট হারানোর পর স্মিথ সম্ভবত বুঝেছিলেন তিনি আউট নন, তাই অন্য কাউকে সুযোগ না দিয়ে নিজেই রিভিউ চাইলেন। তাঁর সাবেক সতীর্থ ডেভিড ওয়ার্নার অবশ্য এই আচরণ পছন্দ করেননি। ওয়ার্নারের মতে, স্টিভ যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, তা ঠিক নয়। এটি তাঁর দেখা দ্রুততম রিভিউ।

অস্ট্রেলিয়ার জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছে। প্রথম ইনিংসে সহজ ক্যাচ ফেলেছেন স্মিথ ও হেড—এর মধ্যে আজ তাসকিন আহমেদের যে ক্যাচটি স্মিথ ফেলেছেন, তা এতই সহজ ছিল যে একে ‘মোয়া’ বলা চলে। ফক্স ক্রিকেটের ধারাভাষ্যকক্ষে বিরতির সময় উপস্থিত অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, মার্ক ওয়াহ ও অ্যালিসা হিলি—তিন অস্ট্রেলীয় ধারাভাষ্যকার—উত্তরসূরীদের পারফরম্যান্স দেখে নিশ্চয়ই স্বস্তি পাচ্ছেন না।

স্মিথ টিকে থাকার মরিয়া চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। তাঁর বিদায়ের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার প্রধান ভরসাও চলে যায়। বাংলাদেশের সমর্থকদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে প্রশান্তির। কারণ দীর্ঘদিন ধরে টেস্ট র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দলকে ছোট দলগুলো বিপাকে ফেলে আসছিল; এবার ভূমিকা পাল্টে যাওয়ায় সেই আনন্দই এখন বাংলাদেশের পাশে। মারারা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বাংলাদেশি সমর্থকদের উদ্‌যাপনের দৃশ্য দেখলে মনে হয়, এতদিন যা ঘটেছে উল্টো, এখন তারই প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে।

ম্যাচের তৃতীয় দিনের শেষ সেশন পর্যন্ত খেলা দেখে মনে হচ্ছে, অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী দলটি এখন চাপে। বিষম চাপের মুখে অস্ট্রেলীয় ব্যাটসম্যানদের কাছ থেকে আরও অদ্ভুত আচরণ দেখা যেতে পারে। এদিকে ডাবল সেঞ্চুরিয়ান জেসন গিলেস্পি তানজিদের কাছে এখন ‘ড্যাডি হানড্রেড’-এর প্রত্যাশা করছেন—অর্থাৎ বড় ইনিংসের আশায় রয়েছেন বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানের ভক্তরা।