২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রকৃত চেতনা খুঁজতে গেলে ফিরে তাকাতে হবে সে সময়ের গান, স্লোগান ও দেয়াললেখার দিকে। অধ্যাপক বখতিয়ার আহমেদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, কীভাবে র্যাপার সেজানের ‘কথা ক’ ট্র্যাকটি ভাষা আন্দোলনের বায়ান্নর চেতনাকে চব্বিশের প্রেক্ষাপটে নিয়ে এসেছিল। সেজানের গানের কথায় প্রশ্ন ছিল, বায়ান্ন আর চব্বিশের মধ্যে ব্যবধান আসলে কোথায়? এই প্রশ্নই যেন আন্দোলনের তরুণদের মুখের ভাষা হয়ে উঠেছিল।
আন্দোলনের শুরুতে ছিল চাকরিতে বৈষম্যের প্রতিবাদ। কিন্তু দ্রুতই তা রূপ নেয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তনের সংগ্রামে। ১৬ জুলাই আবু সাঈদ শহীদ হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সানজিদা তন্বীর রক্তাক্ত মুখ পুরো দেশকে নাড়া দেয়। এরপর ১৮ জুলাই র্যাপার হান্নানের গান ‘আওয়াজ উডা বাংলাদেশ’ আরও তীব্র করে তোলে প্রতিবাদ। সেই দিন থেকেই বন্ধ হয়ে যায় দেশের ইন্টারনেট, বাড়তে থাকে তরুণদের রক্তক্ষয়। কারফিউ জারি করা হলেও থামেনি বিক্ষোভ।
অধ্যাপক আহমেদের মতে, ফরাসি সমাজবিদ এমিল দুর্খাইমের ‘কালেকটিভ এফেরভেসেন্স’ তত্ত্ব অনুযায়ী, বিপ্লবের মুহূর্তে মানুষের যৌথ সত্তা জ্যোতির্ময় হয়। জুলাইয়ের সেই উত্তাল সময়ে তা ঘটেছিল স্পষ্টভাবে। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকরাও ধীরে ধীরে যুক্ত হন আন্দোলনে। ৩০ জুলাই ‘চব্বিশের গেরিলা’ দলের গান ‘বাইর হ!’ স্লোগান দেয় পুরনো ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন যেমন ছিল নাগরিক অধিকার ও অর্থনৈতিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার লড়াই, তেমনি চব্বিশের জুলাইও ছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এক ঐতিহাসিক ধারা। লেখকের পর্যবেক্ষণ, বায়ান্ন ও চব্বিশের মধ্যে কোনো মৌলিক তফাত নেই; চাকরিতে বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক ব্যবস্থাই পাল্টে দেওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। বায়ান্নর চেতনা যেমন একাত্তরে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল, তেমনি জুলাইয়ের চেতনাও ভবিষ্যতের পথ দেখাবে।
তবে বিপ্লবের চেতনা শুধু নির্মিত হয় না, তা বেহাতও হয় ইতিহাসের ধারায়। যেমন একাত্তরের পর স্বপ্নভঙ্গের অধ্যায় শুরু হয়েছিল রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও সামরিক শাসনের মাধ্যমে। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচার পতনের পরও গণতন্ত্রের বিকাশ থমকে যায় দলীয়করণ ও দুর্নীতিতে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসনকালে নাগরিক অধিকার ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ব্যবহার করে বিভাজন সৃষ্টি করা হয়। অন্যদিকে ভিন্নমত দমন, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ ও ভয় তৈরি করে টিকিয়ে রাখা হয় দলতান্ত্রিক স্বৈরশাসন।
জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় সত্য হলো তরুণ প্রজন্মের ভয়কে অস্বীকার করার সাহস। তারা আরও অনেক বছর তরুণই থাকবে, আবার রাস্তায় নেমে আসার সম্ভাবনা তাদের মধ্যে জাগরুক। ‘মেধা না কোটা’ স্লোগান দিয়ে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত তা সরকার পতনের দিকে নিয়ে যায়। এই আন্দোলনে কোনো একক নায়ক নেই, বরং ছাত্র-জনতার সম্মিলিত শক্তিই এর চালিকা শক্তি। আওয়ামী সরকার গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এটিকে প্রতিপক্ষের ষড়যন্ত্র ভাবলেও প্রকৃত চালিকা শক্তি ছিল ১৫ বছরের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ।
অধ্যাপক আহমেদ মনে করেন, চব্বিশের জুলাই আমাদের দেখিয়েছে, বিকল্প ব্যবস্থা সম্ভব। অতীতে ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ব্যর্থ হলেও সেই প্রজন্মই ২০২৪ সালে রাস্তায় নেমে সরকার পতন ঘটিয়েছে। ইতিহাসের পাতায় আপাত ব্যর্থ বিপ্লব থেকেও নতুন বিপ্লবের কল্পনাশক্তি জন্ম নেয়—যেমন ১৮৭১ সালের প্যারি কমিউন ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পথ তৈরি করেছিল। জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা এখন প্রশ্ন তুলেছে, এই নতুন প্রজন্ম কোন নতুন সামাজিক সত্য ও সংহতি গড়ে তুলতে চায়?



