জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ নিয়ে বিভ্রান্তি কাটছে না দুই বছর পরেও। সরকারি গেজেট অনুযায়ী বর্তমানে শহীদের সংখ্যা ৮৪৩ জন। অন্যদিকে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের প্রতিবেদনে ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ৪০০ পর্যন্ত হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের পক্ষ থেকে দেড় হাজার, দুই হাজার বা তার বেশি শহীদের দাবি করা হচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রথম জুলাই শহীদের তালিকা প্রকাশ করে, যেখানে সংখ্যা ছিল ৮৩৪। এরপর জুন মাসে আরও ১০ জনের নাম যুক্ত হলে তা ৮৪৪-এ পৌঁছায়। তবে আগস্ট মাসে তালিকা থেকে আটজনের নাম বাদ দেওয়া হয়। চারজনের নাম দ্বিগুণ থাকায় এবং বাকি চারজন সরাসরি আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত না থাকায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলে সে সময় সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৩৬।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে আরও চারজনের নাম বাদ পড়ে। তবে এপ্রিল মাসে ১২ জনের নাম নতুন করে যুক্ত করা হয়। মে মাসে আবার একজনের নাম বাদ পড়ে। সব মিলিয়ে গেজেটে এখন শহীদের সংখ্যা ৮৪৩। আহতের সংখ্যা ১৪ হাজার ৩৭০। অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, এখন পর্যন্ত ৮৫৬ জনের গেজেট হলেও যাচাই-বাছাইয়ের কারণে কিছু নাম বাদ পড়েছে। বাদ পড়া নামগুলোর জায়গায় আর কাউকে যুক্ত করা হবে না।

জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন তাদের ওয়েবসাইটে শহীদের সংখ্যা ৮২০-র বেশি বলে উল্লেখ করলেও তালিকায় ৮৩৫ জনের নাম রয়েছে। অন্যদিকে ‘জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্স’ নামের একটি সংগঠন দাবি করছে, শহীদের সংখ্যা দেড় হাজারের বেশি, তবে তারা এখন পর্যন্ত ৬৫০ জনের তালিকা প্রকাশ করেছে।

শহীদের সংখ্যা নিয়ে সরকারের নিজস্ব কর্তাব্যক্তিদের মধ্যেও মতভেদ দেখা গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বিভিন্ন ভাষণে কখনও হাজার, কখনও দেড় হাজার, আবার কখনও হাজার হাজার শহীদের কথা বলেছেন। এই বিভ্রান্তি নিরসনে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ মত প্রকাশ করেন, শহীদের চূড়ান্ত তালিকা নির্ধারণ করা সরকারের দায়িত্ব। সরকারের নিজস্ব তথ্য না থাকলে জাতিসংঘের তথ্য যাচাই করেও সুনির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করা উচিত। ক্ষতিপূরণ, জনঅর্থের ব্যবহার ও ইতিহাসের দায়বদ্ধতার কারণে দ্রুত বিভ্রান্তি দূর করে নির্ভুল তালিকা প্রকাশ করা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ারুল নাসের জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যাচাই-বাছাই কার্যক্রম বন্ধ রাখার পরিপত্র জারি হয়েছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হবে। এ জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেবে। অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে আর কোনো শহীদের আবেদন নেই, তবে আহতদের তালিকায় আরও ১ হাজারের বেশি নাম যুক্ত হতে পারে। জনবল সংকটের কারণে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের সময়সীমা নির্ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে না।