ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত গিরোঁদ অঞ্চলে দাবানল ক্রমশ ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। জাতীয় দমকল বাহিনীর মুখপাত্র এরিক ব্রোকার্ডি পরিস্থিতিকে 'ডেভিড বনাম গোলিয়াথ' এর লড়াইয়ের সঙ্গে তুলনা করে জানান, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সারা ফ্রান্সে তাঁদের চার সহকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। গিরোঁদে মোতায়েন করা হয়েছে দুই হাজার দমকলকর্মী, যারা সমুদ্র উপকূল ও বোর্দো শহরের মধ্যবর্তী গ্রামীণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়া আগুন নিয়ন্ত্রণে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন।
স্থানীয় প্রশাসনের এক কর্মকর্তা সতর্ক করে জানিয়েছেন, আবহাওয়া পরিস্থিতি অত্যন্ত প্রতিকূল। এই গ্রীষ্মের চতুর্থ তাপপ্রবাহ বুধবারের মধ্যে শুরু হতে পারে, যা এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে দেবে। তবে আধিকারিকদের মতে, ২ লাখ ৬০ হাজার জনসংখ্যার বোর্দো শহরটি এখনো সরাসরি হুমকির মুখে নেই।
গিরোঁদে দমকল অভিযানের প্রধান কমান্ডার রেমি লাসোরেইলে অবশ্য দাবানলের পশ্চিম প্রান্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, বোর্দো এবং এর মেট্রোপলিটন এলাকায় আগুনের প্রভাব আমাদের ভীত করছে। সোমবার নাগাদ একটি দাবানল বোর্দোর উপকণ্ঠ থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে পৌঁছে গিয়েছিল, যার ফলে শহরের বায়ুর গুণাগুণ গত কয়েক দিনে নাটকীয়ভাবে খারাপ হয়েছে।
এসেক্স থেকে আসা এক পর্যটক বিবিসিকে জানান, রোববার সন্ধ্যার মধ্যে সবকিছু ফাঁকা হয়ে যেতে শুরু করে। তিনি বলেন, বাতাসে প্রচুর ধোঁয়া ও ছাই ছিল, মানুষ ঘরের ভেতরে অবস্থান করছিল, যা ছিল ভয়ানক ও বিষণ্ণ। আরেক বাসিন্দা জানান, অধিকাংশ মানুষ মাস্ক পরে ছিলেন এবং ধোঁয়ার গন্ধ কাপড়ে কয়েক দিন লেগে থাকছিল।
বোর্দোর মার্শে শারট্রন স্কয়ারে এক দমকলকর্মী হাঁটার সময় করতালি পেয়েছিলেন, জানান ওই পর্যটক। স্কয়ারের আশপাশের রেস্তোরাঁগুলো বায়ুতে ছাই থাকায় দরজা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল। বোর্দো ব্রিটিশ কমিউনিটির সভাপতি গ্রাহাম হোয়াইট বলেন, শহরটি অত্যন্ত নীরব হয়ে গেছে, দোকান ও ক্যাফেগুলো প্রায় ফাঁকা। তবে কিছু সংবাদমাধ্যম বোর্দোর পরিস্থিতিকে 'লন্ডনের মহা আগুনের' সঙ্গে তুলনা করলেও বাস্তবে তা নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সোমবার গিরোঁদ অঞ্চলের আগুন-বিধ্বস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, দেশটি 'দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে কঠিন' সম্পূর্ণ অভূতপূর্ব দাবানলের মুখোমুখি হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্টেফানি রিস্ট জানান, বায়ু দূষণের বিষয়ে সরকার 'অত্যন্ত সতর্ক' এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষকে ঘরের ভেতরে থাকার পরামর্শ দেন।
মঙ্গলবার সকালে গিরোঁদ প্রিফেক্ট লাকানাউ উপকূলের সব ক্যাম্পিং সাইট থেকে নতুন করে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন। পাশের শহরের বাসিন্দাদের থাকার অনুমতি দেওয়া হলেও হঠাৎ উচ্ছেদের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। ইতিমধ্যে গোটা ফ্রান্সে ২ লাখ ২০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় চার হাজার পর্যটক সর্বশেষ এই নির্দেশের আওতায় পড়েছেন। কর্মকর্তাদের মতে, প্রায় ২৪০টি বাড়ি-ঘর ধ্বংস হয়েছে।
মঙ্গলবার দুপুর নাগাদ দমকলকর্মীরা অঞ্চলের বিভিন্ন অংশে পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠা আগুন নিয়ন্ত্রণে হস্তক্ষেপ করছিলেন। এদিকে ভ্যার অঞ্চলে আগুন লাগানোর সন্দেহে এক ২৩ বছর বয়সী যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার সর্বোচ্চ ১৫ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।
বোর্দোর পশ্চিম দিকের কয়েকটি ওয়াইন এস্টেটের মধ্যে একটি শ্যাতো পিক কাইউ-এর মহাপরিচালক পেগি প্লুইনেক বিবিসিকে বলেন, ধোঁয়ার কারণে তাদের ব্যবসা সপ্তাহান্তে বন্ধ রাখতে হয়েছিল। তবে রোববার রাতে কিছু বৃষ্টি পরিস্থিতির উন্নতি করেছে। তাঁর মদ বাগান ঝুঁকির মধ্যে না থাকলেও পর্যটকরা এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। তিনি আশঙ্কা করেন, পর্যটন খাত এ গ্রীষ্মে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
গত সপ্তাহান্তে সরিয়ে নেওয়া ক্যাপ ফেরেটের এক বাসিন্দা ফরাসি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, এখন তাঁর মূল উদ্বেগ উপদ্বীপটি নিয়ে, অন্তর্দেশের বড় শহর নিয়ে নয়। তাঁর মতে, বোর্দোতে কেবল কংক্রিট আছে, যা কখনো পোড়ে না। কিন্তু এখানে গাছপালা পুড়ে যাচ্ছে, যা এক বিপর্যয়।




