জাপানের নির্মাণশিল্প বর্তমানে একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। একদিকে তীব্র তাপপ্রবাহ, অন্যদিকে কর্মী সংকট। জুলাই-আগস্টে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁয়ে যায়। সম্প্রতি কুমামোতোর ভূমিকম্পের পর উদ্ধারকাজেও এই গরম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্তৃপক্ষ হিটস্ট্রোক এড়াতে দীর্ঘ সময় বাইরে অবস্থান না করার পরামর্শ দিলেও নির্মাণশিল্পের মতো খাতে সেই সুযোগ সীমিত। এই পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে কাজ এগিয়ে নেওয়ার উদাহরণ দেখিয়েছে জাপানের বৃহত্তম আবাসন ও নির্মাণপ্রতিষ্ঠান দাইওয়া হাউস গ্রুপ। সম্প্রতি টোকিওতে কর্মরত বিভিন্ন দেশের নিবন্ধিত সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তারা ইয়োকোহামার ‘মিনাতো মিরাই–২১ সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট ৫২’ নির্মাণপ্রকল্প পরিদর্শনের আয়োজন করে। সেখানে প্রতিষ্ঠানটি হিটস্ট্রোক প্রতিরোধ, বিদেশি কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং ডিজিটাল নির্মাণ ব্যবস্থাপনার নানা দিক তুলে ধরে।
দাইওয়া হাউস ইন্ডাস্ট্রি কোম্পানি লিমিটেড ১৯৫৫ সালে নোবুও ইশিবাশির হাতে প্রতিষ্ঠিত। বর্তমানে এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নির্মাণপ্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির মূলধন প্রায় ১৬২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ইয়েন এবং সহযোগী কোম্পানির সংখ্যা ৭১৬টি। যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ বিশ্বের ২৭টি দেশ ও অঞ্চলে তাদের কার্যক্রম রয়েছে। ২০২৫ সালে নিট বিক্রি ছিল প্রায় ৩৯ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। একক বাড়ি, কন্ডোমিনিয়াম, বাণিজ্যিক ভবন, ডেটা সেন্টার, জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি দুর্যোগ-পরবর্তী অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণেও সুপরিচিত দাইওয়া। ফুকুশিমা ও কুমামোতো ভূমিকম্পের পর তারা শত শত অস্থায়ী ঘর নির্মাণ করেছিল। পরিবেশবান্ধব স্মার্ট হাউস, দুর্যোগসহনশীল অবকাঠামো এবং কর্মী উন্নয়নে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
ইয়োকোহামা শহরের সমন্বিত নগর উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মিনাতো মিরাই–২১ সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট ৫২ প্রকল্পটি নির্মিত হচ্ছে। ২০২৪ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্প শেষ হবে ২০২৭ সালে। প্রায় ১১ হাজার ৮২০ বর্গমিটার জমির ওপর ভবনটির মোট ফ্লোর এরিয়া হবে প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০০ বর্গমিটার। দুই তলা ভূগর্ভস্থ এবং ২৯ তলা ভূ-উপরিভাগ মিলিয়ে প্রায় ১৮০ মিটার উঁচু হবে ভবনটি। ভূমিকম্পপ্রতিরোধী ইস্পাত ও রিইনফোর্সড কংক্রিট কাঠামোর এই ভবনে থাকবে অফিস, বাণিজ্যিক কেন্দ্র, জাদুঘর, রেস্তোরাঁ, গ্যারেজ এবং তাপ সরবরাহ কেন্দ্র। সাংবাদিকদের প্রকল্পটি ঘুরিয়ে দেখান দাইওয়ার করপোরেট কমিউনিকেশন বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এরিকা কুরোশিমা, প্রযুক্তি সদর দপ্তরের নিরাপত্তা সমন্বয় বিভাগের প্রধান মিহো শিমাদা এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপক মাসাতোশি নাসু।
নির্মাণকাজের বড় ঝুঁকি হলো গরম। প্রকল্পটিতে কয়েক শ কর্মী কাজ করছেন, যাদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ বিদেশি। জাপানের গ্রীষ্মে শুধু তাপমাত্রাই নয়, আর্দ্রতাও থাকে অনেক বেশি। এ কারণে শরীরের ঘাম সহজে বাষ্পীভূত হতে পারে না, যা হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। ২০২৫ সালের মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জাপানে হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে এক লাখের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে কর্মক্ষেত্রে হিটস্ট্রোকজনিত মৃত্যু ও আহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ৬৮১, যা দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে নির্মাণশিল্পে—প্রতি ১৫টি মৃত্যুর মধ্যে পাঁচটিই এই খাতে।
এই পরিস্থিতিতে কর্মক্ষেত্রে হিটস্ট্রোক প্রতিরোধে জোরদার পদক্ষেপ নিয়েছে জাপান সরকার। ২০২৫ সালে সংশোধিত শিল্পনিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য অধ্যাদেশ কার্যকর করা হয়েছে। নতুন বিধান অনুযায়ী, হিটস্ট্রোকের ঝুঁকিতে থাকা কর্মী শনাক্তের জন্য প্রতিটি কর্মস্থলে জরুরি যোগাযোগ কেন্দ্র থাকতে হবে। পাশাপাশি দ্রুত চিকিৎসা ও করণীয় বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশিকা তৈরি করে কর্মীদের জানাতে হবে। নির্মাণশিল্পের জন্য আলাদা তাপপ্রবাহ মোকাবিলা সহায়তা প্যাকেজও চালু করেছে ভূমি, অবকাঠামো, পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।
দাইওয়া হাউস সরকারি নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজস্ব বিস্তারিত নির্দেশিকা তৈরি করেছে। নিরাপত্তা সমন্বয় বিভাগের প্রধান মিহো শিমাদা জানান, প্রতিদিন সকালে কর্মীদের শারীরিক অবস্থা যাচাই করা হয়। নিয়মিত বিরতি, কাজ শুরুর আগে শরীর ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত পানি পান এবং হিটস্ট্রোকের ঘটনা ঘটলে কী করতে হবে—এসব বিষয়ে প্রতিদিন কর্মীদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। তাপপ্রবাহ প্রতিরোধী সামগ্রী কিনতেও কর্মীদের ক্রয়ে সহায়তা দেওয়া হয়।
মিনাতো মিরাই-২১ প্রকল্পে ডব্লিউবিজিটি (ওয়েট বাল্ব গ্লোব টেম্পারেচার) ডিসপ্লে স্থাপন করা হয়েছে। এটি আর্দ্রতা, বিকিরিত তাপ এবং তাপমাত্রার পারস্পরিক অনুপাতনির্ভর একটি সূচক। ডব্লিউবিজিটি সূচক ২৮ এর বেশি হলে হিটস্ট্রোকের ঘটনা অনেক বেড়ে যায়। তাই কাজের সময় কর্মীরা এই সূচকের দিকে খেয়াল রাখেন এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে পানি পানের বিরতি নেন।
নির্মাণস্থলে বিভিন্ন শীতলীকরণ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কর্মীদের দেওয়া হয়েছে ফ্যানযুক্ত বিশেষ পোশাক, যা শরীরের ঘাম দ্রুত শুকিয়ে তাপজনিত ক্লান্তি কমায়। বিনা মূল্যে দেওয়া হয় আইস স্লারি—বরফের ক্ষুদ্র কণা ও ইলেকট্রোলাইটসমৃদ্ধ পানীয়ের মিশ্রণ। ফ্রিজে মজুত থাকে পোকারি সোয়েটসহ বিভিন্ন পানীয়। কম দামে ঠান্ডা পানীয় কেনার জন্য রয়েছে ভেন্ডিং মেশিন। অস্থায়ী শীতলীকরণ কক্ষ তৈরি করা হয়েছে, যেখানে কর্মীরা প্রয়োজনে বিশ্রাম নিতে পারেন। হিটস্ট্রোকের উপসর্গ দেখা দিলে সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসাও দেওয়া হয়। কর্মকর্তারা জানান, বিশ্রামের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই—প্রয়োজন অনুযায়ী যতক্ষণ ইচ্ছা সেখানে থাকা যায়। কক্ষে রয়েছে ওয়াটার কুলার, বরফ তৈরির যন্ত্র এবং ব্যক্তিগত থার্মোসে বরফ ভরে নেওয়ার সুযোগ।
বিদেশি কর্মীদের জন্য ভাষাগত সমস্যা বড় চ্যালেঞ্জ। তাই নিরাপত্তা প্রশিক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটিতে ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, চীন ও ভিয়েতনামের কর্মীরা বেশি কাজ করেন। কর্মকর্তারা বলেন, নির্মাণ কাজের বিভিন্ন ধাপে প্রয়োজনীয় কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে কর্মী নির্বাচন করা হয়, দেশ দেখে নয়। এই কর্মীদের জোগান দেয় সহযোগী বা ঠিকাদার কোম্পানি, তাই তারা সরাসরি দাইওয়া হাউস ইন্ডাস্ট্রির নিয়োগপ্রাপ্ত নন। তবে জাপানের নির্মাণ খাতে শ্রমিক ঘাটতির কারণে ভবিষ্যতে অন্যান্য দেশের কর্মীদেরও এতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিদেশি কর্মীদের প্রকল্পে যোগদানের পরপরই কর্মস্থলে নিরাপদে কাজ করার পদ্ধতি ব্যাখ্যা করা হয়। বর্তমানে জাপানি, ইংরেজি, চীনা, ভিয়েতনামি, ইন্দোনেশীয় এবং ফিলিপিনো ভাষায় প্রশিক্ষণ ভিডিও দেখানো হয়। কর্মীরা কিউআর কোড স্ক্যান করে নিজের ভাষায় ভিডিও দেখতে পারেন। ঝুঁকিপূর্ণ স্থান ও নিরাপত্তা নির্দেশনাও একাধিক ভাষায় দেওয়া হয়েছে।
কর্মী প্রশিক্ষণের পাশাপাশি শ্রম সাশ্রয়ের দিকেও নজর দিচ্ছে দাইওয়া। কর্মী ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে নির্মাণকাজ সহজ এবং শ্রমসাশ্রয়ী করার জন্য বিভিন্ন ডিজিটাল টুল প্রবর্তন করা হয়েছে। নির্মাণস্থলে প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য চালু হয়েছে ‘ফেইসমা’ নামের মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ ব্যবস্থা। এতে অনুমোদনহীন কারও প্রবেশের সুযোগ নেই। আবার হিটস্ট্রোক বা দুর্ঘটনায় ভুক্তভোগীদের শনাক্তকরণও সহজ হয়। একই প্রযুক্তির মাধ্যমে অসংখ্য চাবির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে—কে কোন চাবি নিয়েছেন, কবে ফেরত দিয়েছেন, এসব তথ্য নির্ভুলভাবে জানা যায়। এটি নথিভুক্তির সময়ও কমিয়েছে।
প্রতিদিন কাজের শুরুতে দুই শতাধিক কর্মীর অংশগ্রহণে প্রাতঃকালীন সভা অনুষ্ঠিত হয়। তথ্য আদান-প্রদান সহজ করতে প্রকল্পের বাইরে ১৬০ ইঞ্চির ডিজিটাল ডিসপ্লে এবং টাচ প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় এবং নিরাপত্তা নির্দেশনা আদান-প্রদানে এটি ব্যবহৃত হয়। অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্যও রয়েছে ছোট আকারের ডিসপ্লে ও মনিটর।
কাগজবিহীন প্রকল্প পরিচালনায় ব্যবহার করা হচ্ছে ই-ইয়াচো (eYACHO) নামের ডিজিটাল ফিল্ড নোটবুক। ট্যাবলেটের মাধ্যমে নির্মাণস্থল, প্রধান কার্যালয়, শাখা কার্যালয় এবং ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে, ফলে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত কমে যায়। ডিজিকোর প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাত্র একটি ট্যাপে ডিজিটাল সাইট মার্কিং করা যায়, যা সময় ও শ্রম দুটোই কমায়। এর ফলে গ্রাহকদের ডাইমেনশন লাইন আঁকার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে এবং নির্মাণস্থলে বিস্তারিত নির্দেশনা ও যাচাই-বাছাই কমেছে।
বিল্ডিং ইনফরমেশন মডেলিং (বিম) প্রযুক্তির মাধ্যমে ভবনের ত্রিমাত্রিক নকশা ব্যবহার করে কাঠামো, বৈদ্যুতিক লাইন, পাইপলাইনসহ বিভিন্ন উপাদানের সমন্বয় করা হচ্ছে। কংক্রিটের আয়তন, ইস্পাতের পরিমাণ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণের হিসাবও সহজতর করে এটি। নকশা, নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ—পুরো প্রক্রিয়াকেই আরও কার্যকর করে বিম।
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও কর্মী সংকটের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাপানের নির্মাণশিল্পের এই পথ কেবল প্রযুক্তিনির্ভর নয়, বরং কর্মীদের নিরাপত্তাকেও সমান গুরুত্ব দেয়। দাইওয়ার হিটস্ট্রোক প্রতিরোধ, কর্মী প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা ও শ্রমসাশ্রয়ী প্রযুক্তির সমন্বিত প্রয়োগ বাংলাদেশের নির্মাণশিল্পের জন্যও অনুসরণযোগ্য একটি মডেল হতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে জাপানের নির্মাণ খাতে কাজ করতে আগ্রহী বাংলাদেশি কর্মীদের জন্যও এই অভিজ্ঞতা মূল্যবান প্রস্তুতির অংশ।




