রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেন এক অভিনব কৌশল গ্রহণ করেছে, যা একটি দক্ষ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতার মতো। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা র্যান্ড কর্পোরেশনের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে এই তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জনসংখ্যা ও সামরিক শক্তিতে রাশিয়ার তুলনায় অনেক ছোট হওয়া সত্ত্বেও ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে একটি কার্যকর ‘অ্যাট্রিশন’ বা ক্ষয়ক্ষতি কৌশলের মাধ্যমে উপরি হাত অর্জন করেছে।

গবেষক জিয়ান জেন্টাইল ও অ্যান্ড্রু র্যাডিনের মতে, ইউক্রেনের নেতৃত্ব রুশ সেনা ও অর্থনীতির ওপর সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টি করতে ব্যবসায়িক মূলনীতি কাজে লাগাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, প্রাক্তন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভের যুদ্ধ পরিকল্পনায় নির্ধারিত ‘কেপিআই’ (মূল কর্মক্ষমতা সূচক) অনুযায়ী, দখলকৃত প্রতিটি বর্গকিলোমিটার এলাকার জন্য ২০০ জন রুশ সেনাকে হত্যার লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে। এছাড়াও প্রতি মাসে কমপক্ষে ৫০ হাজার রুশ সেনাকে নির্মূল করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

ফেদোরভ একটি ‘যুদ্ধের গণিত উদ্যোগ’ (ম্যাথমেটিকস অব ওয়ার ইনিশিয়েটিভ) চালু করেছেন, যা যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে ইউক্রেনের অ্যাট্রিশন কৌশলের দক্ষতা বৃদ্ধি করছে। এই উদ্যোগের একটি অংশ হলো ‘ইপয়েন্টস’ ব্যবস্থা, যা বিশ্বের প্রথম বলেও দাবি করা হচ্ছে। ড্রোন চালকরা যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের সাফল্যের ভিডিও সরকারের কাছে জমা দেন এবং একটি প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পয়েন্ট অর্জন করেন। বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুর জন্য পয়েন্টের পরিমাণ ভিন্ন—একজন রুশ সেনা হত্যা করলে ১২ পয়েন্ট পাওয়া যায়। অর্জিত পয়েন্ট সরকারি অনলাইন বাজারে ব্যবহার করে নতুন ড্রোন সংগ্রহ করা হয়, যা পুনরায় যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়।

বর্তমানে ইউক্রেন প্রতি মাসে ৩০ থেকে ৪০ হাজার রুশ সেনাকে হত্যা বা আহত করছে, যা রাশিয়ার নতুন সেনা নিয়োগের ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে গেছে। ফলে রুশ কর্তৃপক্ষ জোর করে পুরুষদের সেনাবাহিনীতে তালিকাভুক্ত করতে বাধ্য হচ্ছে। র্যান্ডের প্রতিবেদনে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা খাতের সাফল্যেরও প্রশংসা করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে নতুন কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল সিস্টেম, প্রশিক্ষণ, সংগঠন এবং দেশীয় ড্রোন শিল্প।

২০২২ সালে রাশিয়ার আক্রমণের পর থেকে ইউক্রেনে হাজার হাজার নতুন কোম্পানি গড়ে উঠেছে। সংখ্যাগতভাবে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করতে নিরন্তর উদ্ভাবন, দ্রুত মাঠপর্যায়ে সরবরাহ এবং ব্যাপক উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা থেকেই এই শিল্পের বিকাশ। ইউক্রেন এখন বছরে লক্ষ লক্ষ ড্রোন উৎপাদন করছে, যা প্রাক্তন সিআইএ পরিচালক জেনারেল ডেভিড পেট্রেয়াসকে ‘স্বাধীন বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শিল্প কমপ্লেক্স’ হিসেবে অভিহিত করতে প্ররোচিত করেছে।

শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, ইউক্রেনের ড্রোন এখন রাশিয়ার গভীরে প্রবেশ করতেও সক্ষম। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়ার তেল শোধনাগার, অস্ত্র কারখানা এবং ই-কমার্স লজিস্টিক হাবগুলোতে আগুন লেগেছে, যা উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যয়বহুল ঋণ ও ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝায় জর্জরিত রুশ অর্থনীতির ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করছে। যুদ্ধ থেকে দূরে থাকা সাধারণ রুশ নাগরিকরাও এখন পেট্রোল পাম্পে লম্বা লাইনে দাঁড়ানো এবং অনলাইন অর্ডার পূরণ না হওয়ার মতো সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।

যদিও সামাজিক মাধ্যম ও কিছু ধনী ব্যবসায়ীর মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে, তবুও ভ্লাদিমির পুতিনের শাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনঅসন্তোষের কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যায়নি। তবে র্যান্ডের বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইউক্রেনের এই ধারাবাহিক অ্যাট্রিশন কৌশল ও দূরপাল্লার হামলা রাশিয়ার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা ভঙ্গ করতে পারে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের উদাহরণ টেনে তারা বলেন, চার বছর ধরে চলে ব্রুটাল অ্যাট্রিশনের পর আমেরিকান সেনাদের আগমন জার্মান সেনাবাহিনীর পতন ত্বরান্বিত করেছিল। র্যান্ডের মতে, একই পরিণতি এড়াতে রাশিয়াকে হয় আলোচনার টেবিলে আসতে হতে পারে, নয়তো একই পরিণতি ভোগ করতে হবে। ইউক্রেনের কৌশলের সাফল্য নির্ভর করছে তার মিত্রদের অব্যাহত সমর্থন এবং নিজস্ব অ্যাট্রিশন কৌশল বজায় রাখার ওপর।