ভারতীয় সংগীত ও চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি শিল্পী কিশোর কুমারের জন্মদিন ৪ আগস্ট। তার বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব এবং রহস্যময় জীবনযাপন নিয়ে অজস্র গল্প প্রচলিত, যার মধ্যে বিস্ময়করভাবে ‘চার’ সংখ্যার পুনরাবৃত্তি একটি উল্লেখযোগ্য কৌতূহলের বিষয়। ১৯২৯ সালের এই দিনে মধ্যপ্রদেশের খান্ডোয়ায় জন্ম নেওয়া কিশোর কুমার ছিলেন পিতা-মাতার চতুর্থ সন্তান। জানা যায়, তিনি চারটি বিয়ে করেছিলেন এবং চারটি বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন। প্রচলিত ধারনা অনুযায়ী, তার জন্ম হয়েছিল ৪ আগস্ট ভোর ৪টায়, যদিও এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রমাণ নেই। তবুও, তার জীবনপঞ্জির নানা অধ্যায়ে এই সংখ্যাটি ফিরে ফিরে আসার ঘটনা ভক্তদের কাছে কৌতূহলের জন্ম দেয়।

শৈশবে থেকেই কিশোরের অপরের কণ্ঠ নকল করার অসাধারণ প্রতিভা ছিল। তিনি কিংবদন্তি গায়ক কে এল সায়গলের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন এবং সায়গলের কণ্ঠ অবিকল অনুকরণ করতে পারতেন। ৯ বছর বয়সে বোম্বে সফরে তার বড় ভাই ও প্রখ্যাত অভিনেতা অশোক কুমারের মাধ্যমে এক অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার সুযোগ পান। ছোট্ট বালকের কণ্ঠে সায়গলের গান শুনে সেসময়ের চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্তরা বিস্মিত হন। পরে সংগীত পরিচালক সরস্বতী দেবীর আগ্রহে 'জন্মভূমি' ছবির একটি দলীয় গানে তার কণ্ঠ যুক্ত হয়। অবশ্য তার আনুষ্ঠানিক প্লেব্যাক যাত্রা শুরু হয় ১৯৪৮ সালের 'জিদ্দি' ছবির মাধ্যমে, যেখানে তিনি দেব আনন্দের জন্য কণ্ঠ দেন। প্রারম্ভিকভাবে তার গায়কিতে সায়গলের প্রভাব থাকলেও, ধীরে ধীরে তিনি নিজস্ব এক স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করেন, যা বৈচিত্র্যে ও আবেগে পরিপূর্ণ ছিল।

শুধু একজন গায়ক নন, কিশোর কুমার ছিলেন একাধারে গীতিকার, সুরকার, সফল অভিনেতা, চলিনেমা পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও প্রযোজক। বাংলা, হিন্দি, মারাঠিসহ অনেক ভাষার গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। তার অভিনীত 'চলতি কা নাম গাড়ি', 'পড়োসন', 'হাফ টিকিট' ইত্যাদি হাস্যরসাত্মক ছবি আজও ক্লাসিক। পর্দায় তার উচ্ছল অভিনয় ও কণ্ঠের বৈচিত্র্য দর্শককে মুগ্ধ করত।

তবে পর্দার বাইরের কিশোর কুমার ছিলেন রহস্যে ঘেরা এক পরাণী। তাকে নিয়ে বহু অদ্ভুত গল্প প্রচলিত ছিল, যার বেশিরভাগই পরে তার পুত্র অমিত কুমার গুজব বলে উড়িয়ে দেন। সবচেয়ে আলোচিত গল্পটি ছিল তার বাড়িতে কঙ্কাল ও মানুষের মাথার খুলি রাখা নিয়ে। অমিত কুমারের কথায়, পূর্ব আফ্রিকার নাইরোবিতে অনুষ্ঠান করে ফেরার পথে এসব সংগ্রহ করেছিলেন তার পিতা। এটি ছিল কিশোরের বিচিত্র ও অ্যান্টিক বস্তু সংগ্রহের শখের অংশ, কাউকে ভয় দেখানো নয়। বরং কিশোর বলতেন, একদিন সবাইকে এই কঙ্কালের মতই হয়ে যেতে হবে।

আরও একটি প্রচলিত গল্প ছিল তার বাড়ির মেঝেতে গোপন ফাঁদ (ট্রাপডোর) থাকা, যা খুলে গিয়ে দর্শনার্থী নিচে পড়ে যাওয়ার কথা। প্রযোজক এসডি নারাং একবার তার সাথে দেখা করতে গিয়ে মেঝেতে পা ঠুকে পরীমান করেন ফাঁদ আছে কিনা, শুনে কিশোর কুমার হেসে ফেটে পড়েন এবং এমন কোন ফাঁদ নেই বলে নিশ্চিত করেন।

কিশোর কুমারের ব্যক্তিগত জীবনেও 'চার' সংখ্যাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তিনি মোট চারবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তার স্ত্রীরা ছিলেন রুমা গুহঠাকুরতা, কিংবদন্তি অভিনেত্রী মধুবালা, যোগিতা বালি ও লীনা চন্দাভারকর। সফলতা ও খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছেও জীবন শেষ দিকে তিনি বারবার ফিরে যেতে চেয়েছিলেন তার জন্মশহর খান্ডোয়ায়। তার মুখে শোনা যেত, 'দুধ-জিলাপি খায়েঙ্গে, খান্ডোয়া মে বস যায়েঙ্গে।' কিন্তু সেই আশা পূরণ হয়নি। ১৯৮৭ সালের ১৩ অক্টোবর, বড় ভাই অশোক কুমারের জন্মদিনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি। তাকে প্রিয় মাতৃভূমি খান্ডোয়ায় সমাধিত করা হয়।