গত সোমবার (৩ আগস্ট) রাত ৯টার দিকে প্রয়াত হয়েছেন অভিনেত্রী রিনা রহমান। তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন অভিনয়শিল্পী সংঘের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ অপু। বেশ কিছুদিন ধরে স্ট্রোকসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। মৃত্যুর পর একটি পুরোনো সাক্ষাৎকার নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সেখানে জীবনের নানা অধ্যায় তুলে ধরেছিলেন রিনা রহমান।

সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, অসুস্থতার পরও কাজ করার ইচ্ছা ছিল প্রবল। বলেছিলেন, 'আমি এখনো চাই যে মরার আগপর্যন্ত আমি যেন কাজটা করতে পারি।' কিন্তু শারীরিক অবস্থা ভালো ছিল না। হাঁটুর সমস্যা, চোখে ছানি পড়াসহ নানা জটিলতা ছিল। আরও জানিয়েছিলেন, 'শরীরটা খুব অসুস্থ হয়ে গেছে। আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, এখনকার সময়ে আমাদের কোনো কাজ নাই। কাজের খুব অভাব হয়ে গেছে।'

অভিনয়ই ছিল তাঁর জীবিকার প্রধান অবলম্বন। তাই কাজ না থাকলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ত। বলেছিলেন, 'যদি কেউ ডেকে একটা কাজ দেয়, তো ডাল-ভাত খাই, এই অবস্থায় আছি।' দীর্ঘ এই পথচলায় পারিশ্রমিকের বিষয়েও আক্ষেপ ছিল তাঁর। সময়ের সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, কিন্তু শিল্পীদের পারিশ্রমিক সেই অনুপাতে বাড়েনি বলে জানান তিনি। রিনা রহমানের কথায়, 'আগেই বলে দেয়, "আপা পয়সা কম। আমরা টাকা পাই নাই, অল্প পয়সায় করে দেন।" তখন মনে হয়, কাজ তো করছি। অন্তত ভাত খাওয়ার মতো পয়সাটা তো পাওয়া উচিত।'

অভিনয়জীবনের শুরু খুলনায়। খুলনা নাট্যনিকেতনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অভিনয় শেখেন তিনি। শুরুতে নাচ শিখলেও পরে গান ও অভিনয়ের দিকে ঝুঁকেন। দীর্ঘদিন খুলনার মঞ্চে কাজ করার পর ঢাকায় এসে মঞ্চনাটকে নিয়মিত অভিনয় করেন। পুরোনো দিনের মঞ্চচর্চার কথা বলতে গিয়ে জানান, এখনকার সময়ে সেই চর্চা অনেকটাই কমে গেছে। তাঁর মতে, অভিনয় শেখার আগ্রহ ও অগ্রজদের প্রতি সম্মানের জায়গাতেও পরিবর্তন এসেছে।

ব্যক্তিজীবনেও নানা কঠিন সময় পেরিয়েছেন রিনা রহমান। অল্প বয়সে স্বামী হারিয়ে সন্তানদের বড় করতে হয়েছে একাই। চার সন্তানকে বড় করে নিজের পায়ে দাঁড় করানোর জন্য লড়াই চালিয়ে গেছেন। বলেছিলেন, 'মেয়ে দিয়েছি, বিয়ে দিয়েছি। শ্বশুরবাড়ি গেলে তো একটা খরচ লাগে। তাই মন চাইলেও সব সময় যেতে পারি না।' সংসারের দায়িত্ব সামলাতে অভিনয়ের পাশাপাশি চাকরিও করেছেন তিনি। সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে হতো। অনেক সময় রাস্তা ভুলে যেতেন, ভাইয়ের ডাকে চলে আসতেন।

শেষ জীবনে শিল্পীদের সম্মানের জায়গাটি নিয়েও আক্ষেপ ছিল তাঁর। বলেন, 'সম্মানটা তো এখন কোথাও নাই।' নতুন প্রজন্মের অনেকেই সিনিয়র শিল্পীদের সংগ্রাম ও অবদান সম্পর্কে জানেন না বলে অভিযোগ ছিল তাঁর। শেষ চাওয়া ছিল খুব সাধারণ—একটু স্বস্তি, মাথা গোঁজার জায়গা ও সম্মান। বলেছিলেন, 'যেন এক মুঠো ডাল-ভাত ঘরে বসে খাইয়ে একটু আল্লাহ-বিল্লাহ করে মরতে পারি। এইটুকুই চাই, আর কিছু না।' পাশাপাশি শিল্পীদের জন্য চেয়েছিলেন সম্মান। বলেছিলেন, 'আমাদের শিল্পীদের চাওয়া খুবই অল্প—শুধু সম্মান, শুধু সম্মান আর ভালোবাসা।'

মৃত্যুর আগে দীপ্ত টেলিভিশনের ধারাবাহিক নাটক 'পরম্পরা'য় 'ময়নার মা' চরিত্রে অভিনয় করছিলেন। কিন্তু ফেব্রুয়ারির পর আর শুটিং করতে পারেননি তিনি। তাঁর অভিনীত জনপ্রিয় কাজের মধ্যে রয়েছে নাটক 'সংশপ্তক', চলচ্চিত্র 'ঘানি', 'ঠিকানা' এবং ধারাবাহিক 'মান অভিমান', 'জবা'।