আর্জেন্টিনায় নবজাতকের নামকরণের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ আইন কার্যকর রয়েছে, যা লিওনেল মেসির পদবী ‘মেসি’-কে প্রথম নাম হিসেবে ব্যবহারে বাধা সৃষ্টি করে। ১৯৬৯ সালে প্রণীত এই আইন অনুসারে, কোনো ব্যক্তির পারিবারিক নাম বা পদবী সন্তানের প্রথম নাম হিসেবে গ্রহণ করা যায় না; কারণ এতে প্রশাসনিক জটিলতা ও পরিচয় বিভ্রান্তির আশঙ্কা থাকে। ফলে মেসির দেশে তাঁর পদবী দিয়ে সন্তানের নাম রাখা আইনত প্রায় অসম্ভব।
২০১৪ সালে রিও নেগ্রো প্রদেশের এক দম্পতি—হেক্টর ভারেলা ও লোরেনা সানচেজ—তাদের নবজাতক পুত্রের নাম ‘মেসি’ রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তাঁরা চেয়েছিলেন সন্তানের নামের মাধ্যমেই ফুটে উঠুক সেই কিংবদন্তি ফুটবলারের পরিচয়, যিনি গোটা দেশের আবেগের প্রতীক। তবে জন্মনিবন্ধনের সময় আইনের বাধার মুখে পড়েন তাঁরা। পরে বিশেষ অনুমতির আবেদন করেন, যা কর্তৃপেক্ষ ব্যতিক্রম হিসেবে মঞ্জুর করে। তবে সঙ্গে স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, আইন সবার জন্য সমান। শেষ পর্যন্ত শিশুটির নাম রাখা হয় ‘মেসি ডেভিড ভারেলা’। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে আরও অনেক বাবা-মা একই আবেদন করতে শুরু করেন, বিশেষ করে মেসির জন্মপ্রদেশ সান্তা ফেতে। কিন্তু সেখানকার নাগরিক নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ কঠোরভাবে জানিয়ে দেয়, পদবী প্রথম নাম হিসেবে ব্যবহারযোগ্য নয়; আইনে কোনো ব্যতিক্রম নেই।
বর্তমানে পুরো আর্জেন্টিনায় মাত্র ১১ জনের প্রথম নাম ‘মেসি’, যাদের সবার বয়স ১৯ বছরের নিচে। অথচ আর্জেন্টিনার বাইরে এই নামের ব্যাপক জনপ্রিয়তা দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রে ২০৫ জন, ফ্রান্সে প্রায় ২৬৫ জন, ব্রাজিলে ৩৬৩ জন এবং পেরুতে ৩ হাজার ৪০২ জনের প্রথম নাম ‘মেসি’। যে দেশে মেসির জন্ম, সেই দেশেই এই নাম সবচেয়ে বিরল—এটি আকর্ষণীয় তথ্য।
তবে আইন ‘লিওনেল’ নামের ওপর কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করেনি। আর্জেন্টিনায় বর্তমানে এক লাখেরও বেশি মানুষের নাম ‘লিওনেল’, যাদের প্রায় ৮৭ শতাংশের বয়স ১৯ বছরের কম। অর্থাৎ, মেসির বার্সেলোনায় উত্থান ও বিশ্বজয়ের পর এই নামের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হয়েছে। ২০২৩ সালে একাই ৯ হাজার ৫০৫টি ছেলে শিশুর নাম ‘লিওনেল’ এবং ৪৪৬টি মেয়েশিশুর নাম ‘লিওনেলা’ রাখা হয়। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালে জন্ম নেওয়া প্রতি ৪৭টি শিশুর মধ্যে একজনের নাম ছিল ‘লিওনেল’ অথবা ‘লিওনেলা’।
মেসির প্রভাব শুধু আর্জেন্টিনায় সীমাবদ্ধ নয়; বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী আর্জেন্টাইন মাউরো আহুমাদা, যিনি ছোটবেলা থেকেই মেসির ভক্ত, তাঁর ছেলের নাম ‘লিওনেল আগুস্তিন’ রাখেন। তিনি মেসির মধ্যনাম ‘আন্দ্রেস’ও রাখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু স্ত্রীর সাবেক প্রেমিকের নাম হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি।
ছোট্ট মেসি ডেভিড ভারেলা এখন স্কুলে পড়ে। বার্সেলোনায় মেসির অভিষেক জার্সি নম্বর ৩০ পরে সে ফুটবল খেলে। তার স্বপ্ন, একদিন নিজের নামের মানুষটির সঙ্গে দেখা করা। তার মা বলেন, রাস্তায় মানুষ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে, ‘ওর নাম সত্যিই মেসি?’—উত্তরে তিনি গর্বিত স্বরে বলেন, ‘হ্যাঁ, সত্যিই।’ একজন ফুটবলারের প্রতি এতটাই ভালোবাসা যে তাঁর নামে সন্তানের নাম রাখতে মানুষ আইনের সঙ্গেও লড়াই করতে প্রস্তুত। মেসি শুধু একজন ফুটবলার নন; তিনি অনুপ্রেরণা, আবেগ ও ভালোবাসার প্রতীক।




