নাইজেরিয়ার সামরিক বাহিনী দক্ষিণাঞ্চলীয় অয়ো রাজ্যের তিনটি স্কুল থেকে দুই মাস আগে অপহৃত মোট ৪৪ জন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করেছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় এক বিবৃতিতে সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ড্যানজুমা জোনা ড্যানজুমা জানান, উদ্ধারকৃত ব্যক্তিরা বর্তমান অজ্ঞাত এক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং পরবর্তী তারিখে তাদের নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যাবেন।
স্থানীয় শিক্ষক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে বিবিসিকে জানানো হয়েছে, এই উদ্ধারে তারা স্বস্তি বোধ করছেন। তবে পরিবারগুলোর ভাষ্য, এই পুরো ঘটনা তাদের জন্য ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং তারা এখনও তাদের প্রিয়জনদের সঙ্গে পুনর্মিলনের অপেক্ষায় রয়েছেন। অভিযানে বেশ কয়েকজন সেনা সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন বলেও সেনাবাহিনী স্বীকার করেছে।
গত ১৫ মে অয়ো রাজ্যের ওসিরি জেলার তিনটি স্কুল—ব্যাপটিস্ট নার্সারি অ্যান্ড প্রাইমারি স্কুল, এলএ প্রাইমারি স্কুল এবং কমিউনিটি গ্রামার স্কুল—থেকে সশস্ত্র বন্দুকধারীরা এই অপহরণ চালায়। ভুক্তভোগীদের বয়স আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা না গেলেও নাইজেরিয়ায় এসব স্কুলের শিক্ষার্থীরা সাধারণত দুই থেকে ১৮ বছর বয়সী হয়ে থাকে।
কমিউনিটি গ্রামার স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা র্যাচেল ফোলাওয়ে আলামুর স্বামী অধ্যাপক ওলে আলামু বিবিসিকে বলেন, পরিবারের সদস্যদের জন্য এই অপেক্ষা ছিল ভয়াবহ। অপহরণকারীদের পক্ষ থেকে প্রকাশিত ভিডিওতে তাঁর স্ত্রী ও অন্যান্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দেখে পরিবারটি বিশেষভাবে কষ্ট পেয়েছে। তবে সবকিছু ভালোভাবে শেষ হওয়ায় তারা ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞ। উদ্ধারে যারা ভূমিকা রেখেছেন, সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন অধ্যাপক আলামু।
অয়ো রাজ্যের শিক্ষক ইউনিয়নের নেতা হাসান আজিবোলা বিবিসিকে বলেন, তিনি অত্যন্ত খুশি ও আনন্দিত। তবে কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানান, এক দশকেরও বেশি আগে চিবোক স্কুলছাত্রী অপহরণের ঘটনার পর চালু করা 'নিরাপদ স্কুল উদ্যোগ'-এর আওতায় আরও শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করতে হবে। তিনি মনে করেন, এই কর্মসূচি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে স্কুলগুলো অনেক বেশি নিরাপদ হবে। নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন, সিসিটিভি, নিয়মিত টহল, স্কুল প্রাঙ্গণ বেড়া দেওয়া এবং কর্মীসংকটে থাকা এলাকায় স্থানীয় নিরাপত্তা গোষ্ঠীর সহায়তা নেওয়ার মতো ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
নাইজেরিয়ায় স্কুল অপহরণের ঘটনা অব্যাহত থাকায় আইনপ্রণেতা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো 'নিরাপদ স্কুল উদ্যোগ'-এর তহবিল কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে তা তদন্তের দাবি জানিয়েছে। অয়ো রাজ্যের অপহরণের ঘটনাটি তার মাত্রার কারণে এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ উত্তরের তুলনায় খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ দক্ষিণ-পশ্চিমে সংঘটিত হওয়ায় সারা দেশে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল।
সেনাবাহিনী জানায়, এই মাসব্যাপী উদ্ধার অভিযানে সেনা, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও স্থানীয় নাগরিক প্রতিরোধ গোষ্ঠী অংশ নেয়। অপহরণের পেছনের ব্যক্তিদের শনাক্ত এবং পুরাতন অয়ো জাতীয় উদ্যানের বনে তাদের সহায়তাকারী নেটওয়ার্ক—যার মধ্যে রয়েছে তথ্যদাতা ও আস্তানা—ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এই বনটি অপরাধী গোষ্ঠী ও জিহাদিদের আস্তানায় পরিণত হওয়া বেশ কয়েকটি দুর্গম এলাকার একটি।
সামরিক বাহিনী অভিযানে তাদের কিছু সদস্য নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করলেও বিস্তারিত জানায়নি। শুক্রবার তারা বেশ কয়েকজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তারের ঘোষণা দিয়েছে, তবে কতজন এখনও পলাতক রয়েছে তা বলা হয়নি। আরও অভিযানের পরিকল্পনা রয়েছে বলেও সেনাবাহিনী জানিয়েছে।
নাইজেরিয়ায় সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নতুন করে ব্যাপক অপহরণের ঘটনা বেড়েছে এবং আগামী বছরের সাধারণ নির্বাচনের আগে নিরাপত্তাহীনতা একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার স্কুল ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্প্রদায়ের আশপাশে নিরাপত্তা জোরদারের কথা বললেও সমালোচকদের মতে, এটি যথেষ্ট নয়।




