ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় শুক্রবার সকাল থেকেই বর্ষা বরণের এক অনন্য আয়োজনে মেতে ওঠে হাজারো মানুষ। একুশে পদকপ্রাপ্ত নৃত্যশিল্পী ও কোরিওগ্রাফার অর্থি আহমেদ ড্যান্স একাডেমির উদ্যোগে আয়োজিত ‘ঘনঘটা ২’ শিরোনামের এই অনুষ্ঠানে সাদা, নীল ও সবুজ রঙের পোশাক পরে উপস্থিত হন দর্শনার্থীরা। আয়োজকদের নির্দেশনা ছিল ছাতা না নিয়ে খোলা আকাশের নিচে বর্ষাকে বরণ করার, তবে আকাশের মেঘ জমলেও বৃষ্টি নামেনি। তবুও উচ্ছ্বাস ও নৃত্যের মাধ্যমে সবাই ভিজে গেছেন বলে মন্তব্য করেন অনেকে।
৯০ মিনিটের এই আয়োজনে ৩ থেকে ৭০ বছর বয়সী তিন শতাধিক শিল্পী ১৬টি নৃত্য পরিবেশন করেন। শিল্পী নির্ঝর চৌধুরীর ‘আল্লাহ মেঘ দে পানি দে’ গানের মাধ্যমে শুরু হয় অনুষ্ঠান। এরপর ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’, ‘আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিনে’, ‘পাগলা হাওয়ার বাদল-দিনে’, ‘এসো শ্যামল সুন্দর’, ‘রুম ঝুম’-এর মতো রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও লোকজ ঐতিহ্যের গানের সুরে মিশে যায় বর্ষার রূপ। শেষে ‘সবাই রাজা’ ও ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’ গানের কম্পোজিশন আয়োজনের দর্শন তুলে ধরে—একসঙ্গে পথ চলা ও মানুষ হয়ে ওঠার সংকল্প।
অর্থি আহমেদের মতে, নগরজীবনে বর্ষা এখন জলাবদ্ধতা, কাদা ও যানজটের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ বাংলার সংস্কৃতিতে বর্ষা মানেই উৎসব, প্রেম, গান ও জীবনের নবজাগরণ। সেই হারিয়ে যাওয়া অনুভূতি খোলা আকাশের নিচে ফিরিয়ে আনতেই এই প্রয়াস। গত বছর প্রথম ঘনঘটায় বৃষ্টি হলেও এবার তা নামেনি, তবে শিল্পীদের নিবেদন ও দর্শকদের ভালোবাসা বকুলতলাকে ভিজিয়ে দিয়েছে বলে তাঁর বিশ্বাস।
আয়োজকরা প্রথমে দুই থেকে তিন হাজার দর্শকের আশা করলেও বাস্তবে মানুষের ঢল নামে। শুধু প্রাঙ্গণ নয়, স্থানসংকুলান না হওয়ায় অনেকেই ভেতরে ঢুকতে পারেননি। দর্শকদের লাইন গিয়ে পৌঁছেছিল শাহবাগ মোড় পর্যন্ত। বকুলতলার প্রতিটি কোণ, গাছের নিচে, দেয়ালের ধারে ও সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে মানুষ পরিবেশনা উপভোগ করেন। অনেকেই মুঠোফোনে স্মৃতি ধরে রাখেন, কেউ নিঃশব্দে গান গুনগুন করেন। ছোট শিশু থেকে প্রবীণ দর্শক—সবার চোখে ছিল মুগ্ধতা।
যাঁরা ভিড়ের কারণে অনুষ্ঠান দেখতে পারেননি, তাঁদের জন্য আলাদা আয়োজনের কথাও ভাবছেন আয়োজকেরা। অর্থি আহমেদ জানান, এত মানুষের আগ্রহ তাঁদের নতুন করে ভাবাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘যাঁরা ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকতে পারেননি, তাঁদের জন্য আলাদা করে আরেকটি আয়োজন করা যায় কি না, সেটিও আমরা বিবেচনা করব।’
ঘনঘটার সবচেয়ে বড় বিস্ময় ছিল মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা শিল্পীরা—যাঁরা পেশাদার নন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক, সরকারি কর্মকর্তা ও গৃহিণী। অনেকে জীবনে প্রথমবার মঞ্চে উঠেছিলেন। অর্থি আহমেদের বহুদিনের স্বপ্ন ছিল এমন একটি পরিসর তৈরি করা, যেখানে বয়স, শরীর বা সামাজিক সংকোচ কাউকে আটকে রাখবে না। করোনাকালে শুরু হওয়া তাঁর অ্যাডাল্ট বিগিনার্স কোর্সে এখন হাজারের বেশি মানুষ নাচ শিখেছেন, অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছেন আরও কয়েক হাজার।
অনুষ্ঠানের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল এর মানবিকতা। বর্ষা উদযাপনের পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য তহবিল সংগ্রহ করা হয়। শিল্পী ও দর্শনার্থীরা জাগো ফাউন্ডেশনের বুথে অনুদান দেন। অর্থি আহমেদের মতে, সংকটের সময়ে শিল্পীদের নির্লিপ্ত থাকার সুযোগ নেই। সহায়তার পরিমাণ বড় না হলেও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছাটাই সবচেয়ে বড়।
হৃদরোগবিশেষজ্ঞ ডা. সাইদুর রহমান দুই মেয়ে সায়রা ও শানায়াকে নিয়ে অনুষ্ঠান দেখতে এসেছিলেন। তিনি বলেন, ‘পয়লা বৈশাখ বা বসন্ত উৎসবের অনেক আয়োজনেই এখন যান্ত্রিকতার ছোঁয়া লাগে; কিন্তু এখানে এসে মনে হলো সত্যিই প্রাণের উৎসবে এসেছি। আমি চাই, আমার মেয়েরা ছোটবেলা থেকেই জানুক আমাদের সংস্কৃতি কত সমৃদ্ধ।’
দিন শেষে বৃষ্টি না নামলেও বকুলতলা থেকে ফিরে যাওয়া মানুষের মুখে ছিল প্রশান্তি। কয়েক ঘণ্টার জন্য তারা ভুলে গিয়েছিল নগরের ক্লান্তি, যানজট ও ব্যস্ততা। সব বর্ষা জল নিয়ে আসে না—কিছু বর্ষা আসে মানুষের ভিড়ে, গানের সুরে, নৃত্যের ছন্দে। আজকের ব্যস্ত সময়ে এমন প্রাণখোলা, অন্তর্ভুক্তিমূলক উদযাপন খুব বেশি দেখা যায় না। বর্ষাকে নতুন করে মানুষের উৎসবে ফিরিয়ে আনার এই হৃদয়ছোঁয়া উদ্যোগের জন্য অর্থি আহমেদ ড্যান্স একাডেমি প্রাপ্য আন্তরিক অভিনন্দন।




