শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো সাধারণ একটি কাজের পেছনে যে নিখুঁত রাসায়নিক প্রক্রিয়া চলমান, তা একসময় অজানা ছিল। রক্তের মাধ্যমে ফুসফুস থেকে দেহের প্রতিটি কোষে অক্সিজেন সরবরাহকারী গুরুত্বপূর্ণ অণু হিমোগ্লোবিনের প্রকৃত রূপ সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরে অন্ধকারে ছিলেন। কেবল তাত্ত্বিক ধারণা নয়, পরমাণুর স্তরে এই অণুটির ত্রিমাত্রিক স্থাপত্য সরাসরি দেখতে চেয়েছিলেন তরুণ বিজ্ঞানী ম্যাক্স পেরুতস। এই প্রশ্নের উত্তর পেতে গিয়ে তিনি একটি বিশাল বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন।
সেই যুগে প্রোটিনের পূর্ণাঙ্গ গঠন নির্ণয়কে প্রায় অসম্ভব হিসেবে বিবেচনা করা হতো। লবণের মতো ক্ষুদ্র অণুর গঠন জানা গেলেও, হিমোগ্লোবিনের ন্যায় হাজার হাজার পরমাণুর জটিল গঠন উন্মোচন করাকে অসাধ্য সাধনের সঙ্গে তুলনা করা হতো। অনেক নামী বিজ্ঞানীই তাঁকে সতর্ক করেছিলেন যে এই পথে কেবল ব্যর্থতাই নেমে আসবে। কিন্তু পেরুতস ছিলেন একরোখা। অদম্য জেদ আর প্রকৃতির রহস্যের প্রতি গভীর টানই ছিল তাঁর পাথেয়। দিনের পর দিন ল্যাবরেটরিতে বসে তিনি প্রোটিনের স্ফটিক বা ক্রিস্টাল তৈরির চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। সেই স্ফটিকের ভেতর দিয়ে এক্স-রে প্রবাহিত করে সংগ্রহ করেছেন হাজার হাজার আলোকবিন্দুর প্রতিফলন।
তবে যাত্রার সবচেয়ে বড় অন্তরায় ছিল ফেজ বা দশা-সংক্রান্ত তথ্যের অনুপস্থিতি। এক্স-রে থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছিল আলো কতটা প্রতিফলিত হয়েছে, কিন্তু আলোর তরঙ্গগুলো নির্দিষ্ট কোন অবস্থানে ছিল, তা অজানা রয়ে যাচ্ছিল। বিষয়টিকে একটি গানের সঙ্গে তুলনা করা যায়, যেখানে গানের কথা থাকলেও সুরটি অনুপস্থিত। এই সীমাবদ্ধতা মেটাতেই তাঁর লেগে যায় বছর। এসময় চারপাশের দৃশ্যপট বদলেছে, সহকর্মীরা অন্য গবেষণায় মনোযোগী হয়েছেন। কিন্তু পেরুতস নড়েননি। অবশেষে এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর তিনি বুদ্ধিদীপ্ত এক সমাধান খুঁজে পান। প্রোটিন স্ফটিকের ভেতরে কিছু ভারী ধাতব পরমাণু যুক্ত করে তিনি ডিফ্র্যাকশন প্যাটার্নে সূক্ষ্ম পরিবর্তন আনতে সক্ষম হন। এই পরিবর্তনের গাণিতিক বিশ্লেষণ করেই উদ্ধার করলেন হারিয়ে যাওয়া ফেজ তথ্য। ধীরে ধীরে কুয়াশা সরে গিয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠল হিমোগ্লোবিনের পূর্ণাঙ্গ ত্রিমাত্রিক রূপ।
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি অণুজীববিজ্ঞান ছিল উত্তেজনায় ঠাসা। ডিএনএর দ্বিসূত্রক গঠন আবিষ্কৃত হওয়ায় সকলের মনোযোগ সেদিকে নিবিষ্ট ছিল। মনে হচ্ছিল, জীবনের সব রহস্যের উত্তর হয়তো ডিএনএর মধ্যেই নিহিত। কিন্তু সেই আলোকপাতের ঠিক পাশেই ছিল এক বিশাল অন্ধকার অঞ্চল—প্রোটিন। ডিএনএতে রক্ষিত সমস্ত তথ্য শেষ পর্যন্ত প্রোটিনেই রূপায়িত হয়। শরীরের প্রতিটি কাজ—চিন্তা করা থেকে শুরু করে দেখা বা শোনা—সবই প্রোটিনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। সহজ ভাষায়, ডিএনএ কেবল নকশা, কিন্তু সেই নকশা অনুযায়ী রাজমিস্ত্রির মতো কাজ করে প্রোটিন। অথচ তখন প্রোটিনের গঠন ছিল প্রায় সম্পূর্ণ অজানা। ঠিক এই মাহেন্দ্রক্ষণে পেরুতসের সিদ্ধান্তটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি ডিএনএর আলো ছেড়ে সেই অন্ধকার অজানার দিকে পা বাড়ালেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, প্রোটিনের গঠন না জানলে ডিএনএর তথ্যও শেষ পর্যন্ত অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
গবেষণা শুরুর পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। অস্ট্রিয়ান বংশোদ্ভূত হওয়ায় পেরুতসকে স্বদেশে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং তিনি সাময়িকভাবে বন্দী হন। ল্যাব থেকে দূরে, চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে কেটে যায় তাঁর দিন। যুদ্ধ শেষে আবার তিনি কেমব্রিজে ফিরে আসেন এবং সেই একই অণুর সামনে গিয়ে দাঁড়ান। দীর্ঘ ২২ বছর তিনি ব্যয় করেছেন কেবল একটিমাত্র প্রোটিনের রহস্যভেদে। এই সময়ে সন্দেহ, প্রচন্ড হতাশা এবং ক্লান্তি তাঁকে বারবার আঁকড়ে ধরেছে। বাইরের জগতে তখন ডিএনএর আবিষ্কার নিয়ে প্রবল উত্তেজনা, দ্রুত সাফল্যের জোয়ার আসছে অন্য গবেষকদের জীবনে। কিন্তু পেরুতস হার মানেননি। তিনি সন্দেহ অনুভব করেছেন, কিন্তু প্রশ্নটিকে কখনো হাতছাড়া করেননি।
পেরুতসের কাছে হিমোগ্লোবিন ছিল নিখুঁত এক গতিশীল যন্ত্র। তিনি আবিষ্কার করলেন, অক্সিজেন গ্রহণ করার পর এই বৃহৎ অণুটি নিজের আকার বদলে ফেলে। চারটি উপাংশ বা সাবইউনিট নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে—যেন তারা একে অপরের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। ফুসফুসে যখন অক্সিজেনের ঘনত্ব বেশি থাকে, তখন একটি অণু হিমোগ্লোবিনের 'হিম' (Heme) গ্রুপের লৌহ পরমাণুর সাথে যুক্ত হয়। এই যুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সমগ্র প্রোটিন অণুর ভেতরে একটি সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটে, যা বাকি অংশগুলোকে আরও দ্রুত অক্সিজেন গ্রহণ করতে সহায়তা করে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় কো-অপারেটিভিটি বা সমবায় আচরণ। আবার শরীরের কোষে পৌঁছানোর পর তাপমাত্রা ও রাসায়নিক প্রভাবের কারণে গঠন বদলে অক্সিজেন ছেড়ে দেয়। পেরুতস প্রমাণ করেন, হিমোগ্লোবিন মূলত দুটি ভিন্ন অবস্থায় থাকতে পারে—একটি অক্সিজেন ধরে রাখে, অন্যটি মুক্ত করে।
কেমব্রিজের ক্যাভেন্ডিশ ল্যাবরেটরিতে পেরুতস একা ছিলেন না। তাঁর পাশেই গবেষক জন কেনড্রু মায়োগ্লোবিন নামে আরেকটি ক্ষুদ্রতর প্রোটিনের রহস্য উন্মোচনে বদ্ধপরিকর ছিলেন। দুজনের লক্ষ্য ছিল অভিন্ন। অবশেষে ১৯৫৮ সালে কেনড্রু প্রথমবারের মতো কোনো প্রোটিনের পূর্ণাঙ্গ ত্রিমাত্রিক রূপ উন্মোচন করে ইতিহাস সৃষ্টি করলেন। এই সাফল্য পেরুতসের যুদ্ধকেও নতুন শক্তি জোগায়। এর কয়েক বছর পর হিমোগ্লোবিনের জটিল গঠনটিও দুনিয়ার সামনে চলে আসে। ১৯৬২ সালে ম্যাক্স পেরুতস এবং জন কেনড্রু যৌথভাবে রসায়নে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
এই কাজের সত্যিকারের গুরুত্ব নোবেল পুরস্কারের মধ্যদিয়ে শেষ হয়ে যায়নি। পেরুতস প্রমাণ করেছিলেন যে প্রোটিনকে দেখা যায়—কেবল রাসায়নিক সংকেত হিসেবে নয়, ত্রিমাত্রিক পরমাণু-স্তরের এক বাস্তব স্থাপত্য হিসেবে। তিনি দেখিয়েছিলেন, প্রোটিনের গঠন এবং কাজ একে অপরের সম্পূরক। আজ ক্যানসারের টার্গেটেড থেরাপি থেকে শুরু করে ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ইনসুলিনের উন্নত সংস্করণ তৈরি—সবই সম্ভব হয়েছে প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক কাঠামো জানার কারণে। আধুনিক ক্রায়ো-ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে আমরা মুহূর্তেই প্রোটিনের গঠন অনুমান করতে পারি, কিন্তু এই সব অগ্রগতির বীজ রোপিত হয়েছিল ম্যাক্স পেরুতসের সেই ২২ বছরের নীরব সাধনায়।




