তারেক মাসুদের ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রথম আলোয় প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে তাঁর স্ত্রী ও সহযোদ্ধা ক্যাথরিন মাসুদ ফিরে দেখেছেন তাঁদের শুরুর দিনগুলো। ২০১৭ সালে নেওয়া সেই সাক্ষাৎকারটি আবারও প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে ক্যাথরিন জানান, আহমদ ছফার কারণেই তারেকের সঙ্গে তাঁর পরিচয়।
কলকাতায় এক বন্ধুর সূত্রে আহমদ ছফার সঙ্গে ক্যাথরিনের পরিচয়। ছফা তখন তাঁকে ঢাকায় এলে দেখা করার আমন্ত্রণ জানান। ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশে এসে ক্যাথরিন দেখেন, ছফা ইন্দিরা রোডের একটি পুরোনো বাড়িতে থাকেন, যদিও তাঁর নিজের বাসা গুলশানে। সেখানে নির্মলেন্দু গুণ, এস এম সুলতানসহ সে সময়ের বহু লেখক-শিল্পীর আনাগোনা ছিল, আর সেই বাড়িটি সবার কাছে ‘পাগলা ঘর’ নামে পরিচিত ছিল। এস এম সুলতানের ছবি দেখে মুগ্ধ হয়ে ক্যাথরিন প্রায়ই সেখানে যেতেন।
১৯৮৭ সালের জুলাইয়ের এক বিকেলে তারেক মাসুদ ফোন করে জানান, ছফা ভাই তাঁকে ডেকেছেন। তখন তারেক ‘আদম সুরত’ নিয়ে কাজ শুরু করেছেন, কিন্তু সেটা খুব বেশি এগোয়নি। ছফা ভাইয়ের সাথেই তখন থাকতেন তিনি, আর ক্যাথরিনের কাছে তারেককে ‘গুরু’ হিসেবে মানতেন ছফা ভাই। ছফা ভাই তারেককে বলেছিলেন, আমেরিকা থেকে আসা এই মেয়ে হয়তো তাঁর কাজে সহায়তা করতে পারে।
১৯৮৮ সালে এরশাদ শাসনের শেষ দিকে টানা হরতাল চলত, আর সে সময় পাগলা ঘরে দীর্ঘ আড্ডা তাদের সম্পর্ককে বন্ধুত্ব থেকে আরও গভীরে নিয়ে যায়। ক্যাথরিন জানান, ছফা ভাই তাদের একসঙ্গে কল্পনা করতেন, কখনো তাকে বলতেন তারেক তার প্রেমে পড়েছে, আবার তারেককে বলতেন ক্যাথরিন তার প্রেমে পড়েছে। ধীরে ধীরে তারা পরস্পরের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠেন।
ক্যাথরিনের ছবি আঁকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তারেক সবসময় চাইতেন তিনি ছবি আঁকুন, কিন্তু সিনেমাকে জীবন ও জীবিকা বানানোর পর সেভাবে আঁকা হয়ে ওঠেনি। নিউইয়র্কে সাড়ে চার বছর থাকাকালীন তিনি ছবি এঁকেছেন। মুক্তির গান নিয়ে কাজের সময় সব টাকা সিনেমায় ব্যয় হয়ে যেত, বাসা ভাড়ার টাকা আলাদা থাকত না। দার্শনিক এক বাড়িওয়ালার কাছে তারা তখন নিজের আঁকা ছবি দিয়ে ভাড়ার অংশ মেটাতেন।
মানুষ হিসেবে তারেককে ক্যাথরিন ‘সবচেয়ে আন-সেক্সিস্ট’ মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেন। কেউ ‘তারেক মাসুদের সিনেমা’ বললে তিনি রেগে যেতেন এবং বলতেন, এটা তো ক্যাথরিনেরও সিনেমা, কেন তার নাম উচ্চারিত হয় না? তারেক ঘর গোছাতে ভালোবাসতেন, কখনো কখনো তাকে দুপুরের খাবারে বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে বাসার আসবাবপত্র পাল্টে দিতেন। তিনি কখনো চাননি ক্যাথরিন গৃহিণী হয়ে থাকুন; বরং সবসময় তাকে একজন পার্টনার হিসেবে সম্মান দিয়েছেন। সিনেমা নিয়ে তাদের মতভেদ হতো, কিন্তু তারেক তার সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন, যেমন প্রযুক্তি ব্যবহারে দূরদর্শিতা। ‘অন্তর্যাত্রা’ দেশের প্রথম ডিজিটাল ফিচার ফিল্ম, কিন্তু হলগুলো তখন বেটা ফরম্যাটে অভ্যস্ত থাকায় ছবিটি নিতে চায়নি; অগ্রিম টাকা দিয়ে তাদের রাজি করাতে হয়েছিল।




