বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের চার দশক পূর্তি উপলক্ষে ২০০৩ সালের ১৪ নভেম্বর প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদের ‘গলা সাধা বনাম কান সাধা’ নিবন্ধটি সম্প্রতি অনলাইনে পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রকাশের সময় প্রথম আলোর অনলাইন কার্যক্রম চালু না থাকায় লেখাটি দীর্ঘদিন শুধু কাগজের পাতাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। সত্তরের দশকের সাহিত্যমনস্ক তরুণ হিসেবে চলচ্চিত্রকে তিনি খাটো চোখে দেখতেন বলেও উল্লেখ করেন তারেক মাসুদ। তবে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদের আয়োজনে একটি মার্কিন প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী দেখার পর তার ধারণা আমূল বদলে যায়। মগবাজার ওয়্যারলেসের কাছে জিএসও কম্পাউন্ডে অনুষ্ঠিত সেই প্রদর্শনীতেই সংসদ আন্দোলনের কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব মুহম্মদ খসরুর সাথে তার প্রথম পরিচয় ঘটে, যেখানে নিয়ে যান তার চাচাতো ভাই কামাল মাহমুদের বন্ধু ও স্থপতি প্রিন্সদা। মাদ্রাসাভিত্তিক শৈশব এবং রক্ষণশীল ধর্মীয় পরিবারে বেড়ে ওঠার কারণে দেশি-বিদেশি বাণিজ্যিক সিনেমার প্রভাব বলয় থেকে তিনি মুক্ত ছিলেন বলেও জানান তিনি। এর কিছুদিন পর প্রিন্সদা তাকে সংসদের কার্যালয়-কাম-লাইব্রেরিতে নিয়ে গেলে চলচ্চিত্র বিষয়ক বিপুল সংখ্যক বই দেখে তিনি বিস্মিত হন। নৃতত্ত্ব, স্থাপত্য, মনস্তত্ত্বের সঙ্গে চলচ্চিত্রের সম্পর্ক নিয়ে লেখা বইগুলো তাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে এবং সেগুলো পড়ার লোভে তিনি নিয়মিত সেখানে যাতায়াত শুরু করেন। তবে নতুন বই দেখাতে খসরু ভাই যতটা আগ্রহী ছিলেন, বই ধার দিতে ততটা উৎসাহী ছিলেন না বলে স্মৃতিচারণ করেন তিনি। এরই মধ্যে তিনি দেখেন রাজেন তরফদার নির্মিত ‘পালঙ্ক’ ছবিটি। নরেন মিত্রের গল্প অবলম্বনে নির্মিত ছবিটি তার পাশের গ্রামের একটি পরিচিত পরিবারকে ঘিরে রচিত। পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সামরিক শাসনামলে সেন্সর বোর্ড ছবিটির মুক্তিযুদ্ধোত্তর সময়ের রঙিন অংশ কেটে দেয়। ছবিটিতে সহকারী হিসেবে কাজ করেছিলেন মুহম্মদ খসরু। সেন্সর বোর্ডের কাটাছেঁড়ার কারণে ‘পৃথক পালঙ্ক’ হিসেবে ছবিটি দেখে তিনি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। সংসদের এক আড্ডায় পালঙ্ক নিয়ে তার মন্তব্য শুনে খসরু ভাই তাকে দুই দিনের মধ্যে তা লিখে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। সংসদের বুলেটিনে প্রকাশের জন্য লেখা জমা না দিলে লাইব্রেরিতে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার ‘ফতোয়াও’ জারি করা হয়। এই বাধ্যবাধকতা থেকেই তার প্রথম লেখালেখির শুরু, এবং মুদ্রিত আকারে নিজের নাম দেখার সেই অভিজ্ঞতার কথাও মনে করেন তিনি। ধীরে ধীরে তিনি উপলব্ধি করেন, ছবি নিয়ে লিখতে বসলে তা আর দেখা থাকে না, হয়ে ওঠে চলচ্চিত্র পাঠ, যা থেকে অনিবার্যভাবে গড়ে ওঠে চলচ্চিত্র বিষয়ক পঠনপাঠন। বর্তমান সময়ে অনেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে দ্রুত নির্মাতা হয়ে উঠছেন, কিন্তু এর কিছু কুফলও চোখে পড়ে। সংসদ চর্চার মধ্য দিয়ে যারা নির্মাণপ্রক্রিয়ায় এসেছেন, তাদের অনেকের মধ্যেই নির্মাতা হওয়ার বাসনা আগে থেকে ছিল না; বরং দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিজের অজান্তেই তারা নির্মাতা হিসেবে নিজেকে আবিষ্কার করেছেন। সংসদ কর্মীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক ছিল—সংসদের কাজ কেবল দর্শক সৃষ্টি করা, নাকি নির্মাতাও তৈরি করা; কার্যক্রম প্রদর্শনী ও প্রকাশনার মধ্যে সীমিত রাখা, নাকি নির্মাণে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া। আশির দশকের গোড়ার দিকে এই বিতর্ক তীব্র হলে তিনি নিজে নির্মাণমুখী ধারার পক্ষে অবস্থান নেন। খসরু ভাই তখন তার প্রস্তাবনার বিপক্ষে লিখিত অবস্থান নেন। তবে সময়ের ব্যবধানে এই বিতর্ক এখন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। কারণ, যিনি বিশ্বাস করতেন সংসদ আন্দোলনের সঙ্গে নির্মাণের কোনো সম্পর্ক নেই, সেই মুহম্মদ খসরু নিজেই সংসদের ব্যানারে ‘হুলিয়া’ স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেন এবং স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আন্দোলনের সূচনা করেন। ঐতিহাসিকভাবে সংসদ আন্দোলন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রায় সব সৃষ্টিশীল নির্মাতা তৈরির পেছনে কাজ করেছে। তার নিজের চলচ্চিত্র শিক্ষার প্রধান স্কুল ছিল এই সংসদ আন্দোলন, যার মেয়াদ ছিল দুই বছরের নয়, দুই দশকের। ফিল্ম আর্কাইভের কোর্স এবং শর্ট ফিল্ম ফোরাম গঠনও সংসদ আন্দোলনেরই ফসল। গান শেখার জন্য যেমন গলা সাধা প্রয়োজন, তেমনি সফল শিল্পী হতে দীর্ঘমেয়াদি ‘কান সাধার’ প্রয়োজন। সংসদ আন্দোলন তাকে এই দুর্লভ কান সাধার সুযোগ করে দিয়েছে বলেও মনে করেন তিনি। শেষে সংসদ আন্দোলন ও মুহম্মদ খসরুর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন, সবাই অপরিণত আচরণ কাটিয়ে উঠে ইতিবাচক আচরণে উদ্বুদ্ধ হবেন। চল্লিশ ওভার ক্রিজে টিকে থাকা একজন সত্যিকারের অধিনায়কের মতো সংগ্রামী মুহম্মদ খসরুকে তিনি প্রথম স্যালুট জানিয়েছেন।