বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা অটুট রাখতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি করার ওপর জোর দিয়েছে দ্য হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন লিমিটেড (এইচএসবিসি)। বিশ্ব বাণিজ্যের ক্রমবদলমান পরিস্থিতি এবং স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির মধ্যে এই পরামর্শ দিল সংস্থাটি।

গত মঙ্গলবার ঢাকায় 'বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিচালনা: ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় বাংলাদেশ' শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে এসব বিষয় উঠে আসে। ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সঙ্গে মতবিনিময়ের অংশ হিসেবে এই আয়োজন করে এইচএসবিসি বাংলাদেশ। বৈশ্বিক ও এশীয় বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতি এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রপ্তানি খাতে তার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন ব্যাংকটির বিশেষজ্ঞরা।

অনুষ্ঠানে দুটি গবেষণাভিত্তিক উপস্থাপনা তুলে ধরা হয়। 'ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত: বদলে যাওয়া বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মূলধন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত' শীর্ষক উপস্থাপনা করেন এইচএসবিসি এশিয়ার গ্লোবাল ট্রেড সলিউশনসের প্রধান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আদিত্য গাহ্লট। অন্যদিকে, বিশ্ব বাণিজ্যের বর্তমান অবস্থা ও বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণাভিত্তিক উপস্থাপনা দেন এইচএসবিসি গ্লোবাল রিসার্চের সিনিয়র ট্রেড ইকোনমিস্ট শানেলা এল রাজানায়াগাম।

উপস্থাপনায় আদিত্য গাহ্লট উল্লেখ করেন, গত পাঁচ দশক ধরে বিশ্ব বাণিজ্য মূলত দক্ষতার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়ে আসছে। তবে এখন করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরবরাহ ব্যবস্থা, মূলধন বিনিয়োগ, রাজস্ব মডেল এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগ — এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক অনিশ্চয়তা ও অপ্রত্যাশিত ঘটনাপ্রবাহ ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতার ধারণাটিকেই বদলে দিয়েছে। এটি এখন শুধু দৈনন্দিন ব্যবসা পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। মূলধন ও তারল্য সংরক্ষণ, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবসার রূপান্তরে অর্থায়নের জন্য সঠিক সময়ে সঠিক মূলধনের প্রয়োজন হয়। তিনি মনে করেন, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী পথ বেছে নেবে, তবে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি পর্যায়ে গ্রাহকদের পাশে থাকতে চায় এইচএসবিসি।

বিশ্ব বাণিজ্যের বর্তমান চ্যালেঞ্জ এবং বাংলাদেশে তার সম্ভাব্য প্রভাব তুলে ধরেন শানেলা এল রাজানায়াগাম। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বৈশ্বিক বাণিজ্য তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে থাকলেও ভবিষ্যতে বেশ কিছু ঝুঁকি রয়েছে। জাহাজ চলাচল খাতের অস্থিরতা, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির পরিবর্তন এবং বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান সংরক্ষণবাদের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। তিনি আরও বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের কারণে বাংলাদেশে কাঠামোগত পরিবর্তন আসছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেই এই উত্তরণের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। তাই প্রধান বাজারগুলোতে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরি, এবং এক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি করা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অনুষ্ঠানে এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহবুব উর রহমান বলেন, বিশ্ব বাণিজ্যের পরিবর্তনের মধ্যেও বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলছে। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তরুণ জনগোষ্ঠী এবং ব্যবসার পরিধি সম্প্রসারিত হচ্ছে। ফলে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করার সুযোগ পাচ্ছে। তিনি আরও মনে করেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বাংলাদেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রস্তুত এবং বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার পাশাপাশি বৈশ্বিক মঞ্চে জায়গা করে নিতেও তারা সক্ষম।

এইচএসবিসি বাংলাদেশের কান্ট্রি হেড অব গ্লোবাল ট্রেড সলিউশনস আহমদ রাবিউল হাসান বলেন, দেশি-বিদেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে যুক্ত হচ্ছে। তাদের এই অগ্রযাত্রায় অংশীদার হতে এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে এইচএসবিসি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বক্তারা আরও উল্লেখ করেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ ও নীতিমালার পরিবর্তনের কারণে বিশ্ব বাণিজ্যের ধারা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এবং সরবরাহ ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন এসেছে। ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে হচ্ছে। ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতা ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ধরে রাখতে তারা নিজেদের বাণিজ্য ও রাজস্ব কৌশল পুনর্বিবেচনা করছে। এইচএসবিসি বাংলাদেশ জানিয়েছে, পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিবেশে দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত রাখতে তারা কাজ করছে এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার হিসেবে কাজ করতে চায়।