প্রযুক্তি বিশ্বের শীর্ষ ধনী ব্যক্তিরা নিজেদের সন্তানদের জন্য যে পণ্য তৈরি করে ধনী হয়েছেন, সেই পণ্যই ব্যবহারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছেন। ২০১০ সালে অ্যাপলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছিলেন, তার সন্তানরা কখনো আইপ্যাড ব্যবহার করেনি এবং বাড়িতে প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত রাখা হয়। সেই ধারা আরও জোরদার হয়েছে সামাজিক মাধ্যম ও শর্ট-ফর্ম ভিডিওর উত্থানের পর।
সিলিকন ভ্যালির বিনিয়োগকারী পিটার থিয়েল সম্প্রতি অ্যাসপেন আইডিয়াস ফেস্টিভ্যালে বলেন, তিনি তার দুই ছোট সন্তানকে সপ্তাহে মাত্র দেড় ঘণ্টা স্ক্রিন ব্যবহারের অনুমতি দেন। এই কথা শুনে দর্শকদের মধ্যে হতবাক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ইউটিউবের সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ চেন গত বছর স্ট্যানফোর্ডে এক আলোচনায় বলেছিলেন, তিনি চান না তার সন্তানরা শুধু শর্ট-ফর্ম কনটেন্ট দেখুক, বরং ১৫ মিনিটের বেশি দীর্ঘ ভিডিওতে সীমাবদ্ধ রাখাই ভালো। তার মতে, সংক্ষিপ্ত কনটেন্ট মনোযোগের সময়সীমা কমিয়ে দেয়।
মাইক্রোসফটের বিল গেটস তার সন্তানদের ১৪ বছর বয়সের আগে স্মার্টফোন দেননি এবং খাবারের টেবিলে ফোন নিষিদ্ধ করেছিলেন। স্ন্যাপের সিইও ইভান স্পিগেল ২০১৮ সালে জানান, তার সন্তানও সপ্তাহে দেড় ঘণ্টা স্ক্রিন ব্যবহার করে। টেসলা ও এক্সের মালিক এলন মাস্ক স্বীকার করেন, তার সন্তানদের জন্য সামাজিক মাধ্যমের কোনো নিয়ম না রাখা সম্ভবত ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। টিকটকের সিইও শৌ জি চেউ ২০২৩ সালে বলেন, যদি তার সন্তানরা যুক্তরাষ্ট্রে থাকে এবং প্ল্যাটফর্মের কঠোর ১৩ বছরের নিচের সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকে, তাহলে তিনি তাদের অ্যাপ ব্যবহার করতে দেবেন। এমনকি আট বছর বয়সী শিশুও নির্ধারিত কনটেন্ট ও পোস্ট না করার ব্যবস্থায় অ্যাপ ব্যবহার করতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বৈজ্ঞানিক গবেষণাও এই অভিভাবকত্বের পক্ষে কথা বলছে। ২০২৫ সালে প্রায় এক লাখ মানুষের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, শর্ট-ফর্ম ভিডিও ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে জ্ঞানীয় দুর্বলতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে, তরুণরা অনলাইনে অধিক সময় কাটানোর ফলে সামাজিক মাধ্যমের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া বাড়ছে। গত বছর অস্ট্রেলিয়া ও মালয়েশিয়া প্রথম দেশ হিসেবে ১৬ বছরের নিচে কিশোরদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। ফ্রান্স, ডেনমার্ক ও যুক্তরাজ্যও একই ধরনের আইন বিবেচনা করছে। তবে এই আইনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ৫০টি জাল ১৬ বছর বয়সী অ্যাকাউন্টের বয়স যাচাই করতে ব্যর্থ হয়েছে প্ল্যাটফর্মগুলো।
উল্লেখ্য, সামাজিক মাধ্যমের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। তবে যারা মনোযোগের অর্থনীতি তৈরি করেছেন, তারাই এই বিষয়ে সবচেয়ে সতর্ক। যদিও কিছু সিইও প্ল্যাটফর্মের ক্ষতিকর প্রভাব অস্বীকার করেন। ইনস্টাগ্রামের প্রধান অ্যাডাম মোসেরি এ বছর আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে বলেন, সামাজিক মাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার 'ক্লিনিক্যাল আসক্তি' নয়। মেটার আইনজীবীরা তরুণ ব্যবহারকারীদের জন্য বিভিন্ন সুরক্ষা ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেন, যেমন রাতে নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা। তবে সিলিকন ভ্যালির শীর্ষ ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত আচরণ তাদের তৈরি ও প্রচারিত পণ্যের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে।

