হলিউডের অন্যতম সেরা ও জনপ্রিয় অভিনেত্রী হিসেবে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করেছেন জেনিফার লরেন্স। শুক্রবার (১৫ আগস্ট) ৩৬ বছরে পা দিলেন তিনি। মাত্র ২২ বছর বয়সে সেরা অভিনেত্রী বিভাগে অস্কার জেতা এই তারকার ঝুলিতে রয়েছে গোল্ডেন গ্লোব, বাফটাসহ একের পর এক prestigious পুরস্কার। ‘দ্য হাঙ্গার গেমস’-এর ক্যাটনিস এভারডিন থেকে শুরু করে ‘উইন্টার্স বোন’ ও ‘সিলভার লাইনিংস প্লেবুক’-এর জটিল সব চরিত্রে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি।

১৯৯০ সালের ১৫ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের কেনটাকির লুইসভিলে জন্ম তাঁর। বাবা গ্যারি লরেন্স নির্মাণ ব্যবসার সাথে যুক্ত ছিলেন এবং মা কারেন একটি শিশু ক্যাম্প পরিচালনা করতেন। দুই বড় ভাইয়ের সাথে বেড়ে ওঠা জেনিফারের শৈশব ছিল দুরন্ত। ঘোড়ায় চড়া, ফিল্ড হকি, সফটবল, বাস্কেটবল—খেলাধুলায়ও ছিল তার দারুণ সক্রিয়তা। তবে ছোটবেলায় নিজেকে অনেকটা ‘বেমানান’ মনে হতো বলে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন তিনি। অতিরিক্ত চঞ্চলতা ও সামাজিক অস্বস্তির কারণে অন্যদের সাথে সহজে মিশতে পারতেন না। অভিনয়ই ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে এমন একটি জায়গা, যেখানে নিজের সব অস্বস্তি ভুলে থাকা সম্ভব ছিল।

মাত্র ১৪ বছর বয়সে নিউইয়র্কে পারিবারিক সফরে গিয়ে এক প্রতিভা অন্বেষকের নজরে পড়েন জেনিফার। তার তোলা ছবি দেখে পরদিনই অডিশনের প্রস্তাব আসে। অডিশনে মুগ্ধ এজেন্টরা। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। স্কুলের পড়াশোনা মাত্র দুই বছরেই শেষ করে অভিনয়কেই পেশা হিসেবে বেছে নেন তিনি। ২০০৭ সালে ‘দ্য বিল এনভাল শো’-তে নিয়মিত চরিত্রে কাজের সুযোগ পান। এরপর ‘গার্ডেন পার্টি’ দিয়ে বড় পর্দায় অভিষেক। ২০০৮ সালে ‘দ্য বার্নিং প্লেন’-এ অভিনয় করে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে মারচেলো মাস্ত্রোয়ান্নি পুরস্কার পান।

ক্যারিয়ারের প্রথম বড় মোড় আসে ২০১০ সালে। ডেবরা গ্র্যানিক পরিচালিত স্বাধীন চলচ্চিত্র ‘উইন্টার্স বোন’-এ দরিদ্র পরিবারের কিশোরী রি ডলি চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। ছবিটি সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায় এবং মাত্র ২০ বছর বয়সে সেরা অভিনেত্রী বিভাগে অস্কার মনোনয়ন পান জেনিফার। এরপর ২০১২ সালে ‘দ্য হাঙ্গার গেমস’-এর ক্যাটনিস এভারডিন চরিত্র তাকে রাতারাতি বিশ্ব তারকা বানিয়ে দেয়। বেঁচে থাকার লড়াইয়ে নামা এক তরুণীর চরিত্রে তার অভিনয় দর্শকদের মনে দাগ কাটে। প্রথম সিনেমায় তার পারিশ্রমিক ছিল প্রায় ৫ লাখ ডলার, কিন্তু ফ্র্যাঞ্চাইজির সাফল্যের সাথে সাথে পারিশ্রমিক ও লাভের অংশও দ্রুত বাড়ে।

২০১২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সিলভার লাইনিংস প্লেবুক’-এ ব্র্যাডলি কুপারের বিপরীতে ‘টিফানি ম্যাক্সওয়েল’ চরিত্রে অভিনয় করে ২০১৩ সালের অস্কারে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার জেতেন জেনিফার। বয়স তখন মাত্র ২২ বছর। অস্কারের ইতিহাসে এ বিভাগে দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ বিজয়ী এবং ১৯৯০-এর দশকে জন্ম নেওয়া প্রথম অভিনয়শিল্পী হিসেবে এই পুরস্কার পান তিনি। পুরস্কার নিতে গিয়ে মঞ্চে পড়ে যাওয়ার ঘটনাটিও হয়ে যায় তার ব্যক্তিত্বের প্রতীক। এরপর ‘আমেরিকান হাসল’-এ পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করে বাফটা পুরস্কার পান। ‘জয়’-এ ব্যবসায়ী জয় ম্যাঙ্গানোর চরিত্রে অভিনয় করে আবারও অস্কার মনোনয়ন পান। ‘এক্স-মেন’ সিরিজে মিস্টিক চরিত্রে অভিনয় তাকে আরেকটি বড় ফ্র্যাঞ্চাইজির মুখ করে তোলে। তার অভিনীত সিনেমাগুলোর সম্মিলিত বৈশ্বিক আয় ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

২০১৫ সালে ফোর্বস জানায়, এক বছরে তার আয় ছিল আনুমানিক ৫ কোটি ২০ লাখ ডলার, যা তাকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনেত্রীতে পরিণত করে। পরের বছরও এই তালিকার শীর্ষে ছিলেন তিনি। তবে সাফল্যের পাশাপাশি হলিউডের পারিশ্রমিক বৈষম্যের বিরুদ্ধেও সরব হয়েছিলেন জেনিফার। ‘আমেরিকান হাসল’-এর লাভের অংশে পুরুষ সহশিল্পীদের তুলনায় নারীদের কম অংশ দেওয়ার ঘটনা প্রকাশ্যে এলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ২০১৪ সালে হ্যাক করে বহু তারকার ব্যক্তিগত ছবি অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনার শিকারও হয়েছিলেন তিনি, যাকে তিনি ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ওপর গুরুতর আক্রমণ হিসেবে বর্ণনা করেন।

ব্যক্তিগত জীবনে ‘এক্স-মেন’ সহশিল্পী নিকোলাস হল্ট ও পরিচালক ড্যারেন অ্যারোনোফস্কির সাথে সম্পর্কের পর ২০১৮ সালে শিল্পকর্ম বিক্রেতা কুক মারোনির সাথে সম্পর্কে জড়ান। ২০১৯ সালের অক্টোবরে রোড আইল্যান্ডে বিয়ে করেন তাঁরা। ২০২২ সালে তাদের প্রথম সন্তান, ছেলে সাইয়ের জন্ম হয়। ২০২৫ সালে দ্বিতীয় সন্তান আসে। মাতৃত্ব নিয়ে জেনিফার বলেছেন, সন্তান জন্মের পর তার পৃথিবী যেন নতুন করে শুরু হয়েছে।

২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি অতিরিক্ত খ্যাতির চাপে কিছুটা বিরতি নেন তিনি। ২০২১ সালে ‘ডোন্ট লুক আপ’ দিয়ে বড় পর্দায় ফেরেন। এরপর ‘কজওয়ে’-এর মতো ছোট পরিসরের চলচ্চিত্রেও অভিনয় করে দেখান তিনি শুধু বড় বাজেটের তারকা নন। ২০১৮ সালে নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘আ এক্সিলেন্ট ক্যাডেভার’ গড়ে তোলেন তিনি। ‘নো হার্ড ফিলিংস’, ‘ব্রেড অ্যান্ড রোজেস’-সহ বেশ কিছু প্রকল্পে প্রযোজক হিসেবে যুক্ত হয়েছেন। ২০২৬ সালে ‘দ্য হাঙ্গার গেমস: সানরাইজ অন দ্য রিপিং’-এ ক্যাটনিস চরিত্রে ফিরছেন তিনি, যেখানে জশ হাচারসনও পিটা চরিত্রে থাকছেন।

জেনিফার লরেন্সের আনুমানিক সম্পদের পরিমাণ ১৬ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৯৫০ থেকে ১ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা। বর্তমানে দুই সন্তানকে নিয়ে ব্যস্ত এই অভিনেত্রী প্রচারের আলো এড়িয়ে চলেন। নতুন সিনেমার প্রচার ছাড়া তাকে সেভাবে প্রকাশ্যে দেখা যায় না।