স্ট্রিমিং জায়ান্ট নেটফ্লিক্সে মুক্তির পরপরই ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করেছে থ্রিলার সিনেমা ‘দ্য লাস্ট হাউস’। প্রকাশের মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ছবিটি ২ কোটি ৭৫ লাখ ভিউ সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে। ৩ থেকে ৯ আগস্ট পর্যন্ত সপ্তাহের হিসেবে নেটফ্লিক্সের সবচেয়ে বেশি দেখা ইংরেজি ভাষার কনটেন্টের তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করেছে সিনেমাটি। এমনকি সেই সপ্তাহে প্ল্যাটফর্মটির সামগ্রিক দর্শকসংখ্যার বিচারেও সবার ওপরে অবস্থান করছে এটি। ফলে মুক্তি পাওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই সিনেমাটি নেটফ্লিক্সের বহুল আলোচিত কনটেন্টে পরিণত হয়েছে।

ছবির কেন্দ্রীয় ভাবনা একটি বিচ্ছিন্ন বাড়ি। চারদিকে অবিরাম বৃষ্টি, দরজা-জানালা খোলার উপায় নেই, ফোন কিংবা ইন্টারনেট—কোনো যোগাযোগ মাধ্যমই কাজ করছে না। চারজন মানুষ আস্তে আস্তে উপলব্ধি করতে শুরু করে যে তারা কেবল নিজেদের ঘরেই আটকে পড়েনি, সম্ভবত পুরো বিশ্ব থেকেই তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এখানে ভয়ের উৎস কোনো অলৌকিক শক্তি নয়; বরং বাড়ি থেকে বের হওয়ার কোনো পথ না থাকাটাই হয়ে ওঠে প্রধান আতঙ্ক। এই ধারণার ওপরই পুরো কাহিনি নির্মিত হয়েছে।

৭ আগস্ট মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই ছবিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দারুণ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেক দর্শক মনে করছেন, অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি এবং রহস্য ধরে রাখার কৌশলটি অত্যন্ত কার্যকর হয়েছে। অন্যদিকে, একটি বড় অংশের মত, চমৎকার একটি ধারণা শেষ পর্যন্ত দুর্বল চিত্রনাট্যের কারণে পুরোপুরি ফুটে ওঠেনি। ‘দ্য লাস্ট হাউস’কে শুধুই হরর সিনেমা হিসেবে আখ্যা দেওয়া যায় না; নেটফ্লিক্স নিজেই ছবিটিকে সায়েন্স ফিকশন, হরর এবং থ্রিলারের সমন্বয় হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।

সমালোচকদের একাংশের মতে, ভয় দেখানোর চেয়ে ছবিটি পরিবারের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক ও মানসিক চাপের প্রতিই বেশি জোর দিয়েছে। বাইরের অজানা ভয়ের পাশাপাশি চারজন মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কই এখানে মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। ক্ষুধা, আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘদিনের বন্দিত্ব—এই সবকিছু মিলিয়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ওপরও চাপ সৃষ্টি হয়। সন্তানদের সামনে দৃঢ় থাকার প্রয়াসে মা-বাবাকে নিজেদের ভয় লুকিয়ে রাখতে হয়। অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়িটি বাইরের বিপদ থেকে রক্ষার আশ্রয়স্থল না থেকে মানসিক কারাগারে রূপ নেয়।

ছবির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ অভিনেত্রী গ্রেটা লি। ‘পাস্ট লাইভস’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করা এই অভিনেত্রী এখানে রাইলি চরিত্রে দেখা যাচ্ছে। রাইলি এমন একজন মা, যাকে একই সঙ্গে সন্তানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হচ্ছে, স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক সামলাতে হচ্ছে এবং নিজের ভয়কে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হচ্ছে। এই চরিত্রে বড় অ্যাকশন দৃশ্যের বদলে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে মুখের অভিব্যক্তি, নীরবতা ও আতঙ্ক। অন্যদিকে, ব্রাজিলিয়ান অভিনেতা ওয়াগনার মৌরা আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে ‘নার্কোস’-এর পাবলো এসকোবার চরিত্রের জন্য পরিচিত। এবার তিনি জেসন চরিত্রে অভিনয় করেছেন—একজন বাবা, যিনি শুরুতে পরিস্থিতির যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা খোঁজার চেষ্টা করেন; কিন্তু সময় যত এগোয়, বাস্তবতার সঙ্গে তাঁর লড়াই তত জটিল হয়ে ওঠে।

পরিচালক লুই লেতেরিয়ের এর আগে বড় বাজেটের অ্যাকশন ও ফ্যান্টাসি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে ‘দ্য ইনক্রেডিবল হাল্ক’, ‘নাউ ইউ সি মি’ এবং ‘ফাস্ট এক্স’। তবে এই ছবিতে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হেঁটেছেন—বিশাল অ্যাকশন সেটের বদলে প্রায় পুরো গল্পকে একটিমাত্র বাড়ির ভেতরে সীমাবদ্ধ রেখেছেন। এই আবির্ভাবেই সিনেমাটি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

বিশ্বব্যাপী দর্শকরা সিনেমাটি পছন্দ করলেও সমালোচকদের একটি বড় অংশ চিত্রনাট্য নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছে। সিনেমাবিষয়ক সাইট ডিসাইডার ছবিটিকে দুর্বল সায়েন্স ফিকশন থ্রিলার হিসেবে অভিহিত করেছে। তাদের মতে, শক্তিশালী অভিনয়শিল্পীদের নিয়েও ছবিটি চরিত্রগুলোর যথেষ্ট বিকাশ ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে। রহস্যময় ঘটনার ব্যাখ্যা এবং সমাপ্তিও সমালোচনার মুখে পড়েছে। আরও কয়েকজন সমালোচকের অভিমত, প্রারম্ভিক অংশে যে রহস্যের সৃষ্টি হয়, দ্বিতীয়ার্ধে গিয়ে তার অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়; শুরুতে যত বড় প্রশ্ন উত্থাপিত হয়, শেষ পর্যন্ত তার উত্তর ততটা সন্তোষজনক নয়।