হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনা নতুন মোড় নিয়েছে। দুই পক্ষই একে অপরের প্রতি নতুন নতুন শর্ত আরোপ করায় পাঁচ মাস ধরে চলা যুদ্ধের স্থায়ী সমাধানের সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। মার্কিন প্রশাসন দাবি করছে, তারা সরাসরি সংলাপে অংশ নিচ্ছে; তবে তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, কেবল ওমানের মাধ্যমেই আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। এমনকি প্রণালিটির ভবিষ্যৎ পরিচালনার দায়িত্ব ওমানকে সঙ্গে নিয়ে যৌথভাবে পালনের প্রস্তাবও দিয়েছে ইরান।
সংঘাত শুরুর আগে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই কৌশলগত জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, বিগত কয়েক দশকে ইরানের নানা কর্মকাণ্ডে যারা প্রাণ হারিয়েছেন বা আহত হয়েছেন, তাদের জন্য দেশটিকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এর আগে গত সপ্তাহে ইরানও যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ওয়াশিংটনের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করে। তেহরানের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শর্ত মেনে নেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালি ইস্যুর সমাধান না হওয়া পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের শান্তি আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। আল-জাজিরার তেহরান প্রতিনিধি তৌহিদ আসাদি মনে করছেন, দুই পক্ষের অবস্থান দিন দিন আরও কঠিন হচ্ছে এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথ থেকে তারা ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। সর্বশেষ ঘটনাপ্রবাহ ওমান ও ইরানের মধ্যকার প্রণালি ব্যবস্থাপনা নিয়ে চলমান আলোচনাকেও জটিল করে তুলতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের বলেন, বিগত ৫০ বছরে ইরানের কারণে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য তারা অর্থ দাবি করবেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে ২০০০ সালের অক্টোবরে ইয়েমেনে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস কোলের ওপর হামলায় নিহত ১৭ নাবিকের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান। এছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিহত ইরানিদের পরিবার এবং লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন ও গাজার মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতির দায়ও তেহরানকে বহন করার কথা বলেন তিনি। উল্লেখ্য, ইউএসএস কোল হামলার দায় আল-কায়েদা স্বীকার করেছিল।
ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থান তার ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের সম্প্রতি প্রকাশ করা আশাবাদী মন্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। গত শনিবার ভ্যান্স বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব এবং সেই চুক্তি মার্কিন জনগণের জন্য কল্যাণকর হবে। তিনি আরও জানান, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য টোল আরোপের কোনো পরিকল্পনা নেই বলে তেহরান ওয়াশিংটনকে জানিয়েছে। তবে ট্রাম্পের নতুন দাবির পর সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ৫ শতাংশের বেশি বেড়ে যায় এবং মঙ্গলবারও চুক্তির আশা ক্ষীণ হওয়ায় দাম আরও বাড়তে দেখা যায়।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ গত শনিবার ছয়টি শর্ত ঘোষণা করে। শর্তগুলো হলো—যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি ও অপমানজনক বক্তব্য বন্ধ; ইরান এবং লেবানন, ফিলিস্তিন, ইয়েমেন ও ইরাকে তাদের মিত্রদের ওপর হামলা স্থায়ীভাবে বন্ধ; ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া ও আশপাশ থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার; দুটি 'চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের' ক্ষতিপূরণ (গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধ এবং ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সাথে ১২ দিনের যুদ্ধ); সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং জব্দ করা সম্পদ শর্তহীনভাবে ফিরিয়ে দেওয়া।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে নতুন নৌ চলাচলব্যবস্থা নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা 'চূড়ান্ত পর্যায়ে' পৌঁছেছে। এই ব্যবস্থায় প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য নতুন নৌপথ নির্ধারণ করা হবে। তিনি আবারও জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সরাসরি আলোচনা নেই; তবে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্লেষক নিগার মরতাজাভি মনে করেন, গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শুরুর আগে দুই পক্ষই সর্বোচ্চ দাবি উপস্থাপন করছে। সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির এই জ্যেষ্ঠ ফেলোর মতে, ট্রাম্পের নতুন দাবিগুলো বিশেষভাবে সমস্যাজনক, কারণ এগুলো শুধু বর্তমান সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বিক্ষোভ ও অতীতের ঘটনার ক্ষতিপূরণও অন্তর্ভুক্ত। যদি এসব দাবি প্রকৃত চুক্তির শর্ত হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তেহরানের পক্ষে তা মেনে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন হবে। তেহরানও ভবিষ্যতে সংঘাত না ঘটার নিশ্চয়তা এবং অর্থনৈতিক স্বস্তি চাইছে। এর আগে তেহরান জানিয়েছিল, আলোচনার সময়ও যুক্তরাষ্ট্র তিনবার ইরানে হামলা চালিয়েছে, ফলে তাদের আলোচকদের ওপর আস্থা কমে গেছে।
তেহরানভিত্তিক রাজনীতি বিশ্লেষক হোসেন রয়ভারানের মতে, বর্তমান অচলাবস্থার পরিণতি নির্ভর করছে কোন পক্ষ কতটা চাপ সহ্য করতে পারে তার ওপর। তিনি বলেন, এখনকার সমীকরণ হলো 'প্রণালি বন্ধ বনাম অবরোধ', কিন্তু প্রশ্ন হলো কে আগে হার মানবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, জ্বালানির দাম, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও অসন্তোষ রয়েছে। ইরানের জনগণ অবশ্য মনে করে, যুদ্ধ তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং আত্মরক্ষা ছাড়া তাদের কোনো উপায় ছিল না।




