বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত ১১ মাসে বাংলাদেশে মোট ৩ হাজার ২৭৭ কোটি মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, এই অঙ্কের ৬২ শতাংশই জমা হয়েছে মাত্র পাঁচটি নির্দিষ্ট দেশ থেকে। দেশগুলো হলো সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), মালয়েশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। ওই সময়ের মধ্যে সৌদি আরব থেকে এসেছে সর্বোচ্চ ৫২৭ কোটি ৯৭ লাখ ডলার, যা মোট আয়ের ১৬ শতাংশের সমান। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা যুক্তরাজ্য থেকে ৪৬৮ কোটি ৫৮ লাখ ডলার, ইউএই থেকে ৪২৭ কোটি ৮২ লাখ ডলার, মালয়েশিয়া থেকে ৩২২ কোটি ডলার এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৭৮ কোটি ৯৬ লাখ ডলার পাঠানো হয়েছে। এই পাঁচ দেশ মিলে মোট ২ হাজার ২৫ কোটি ডলার এনেছে, যা মোট রেমিট্যান্সের ৬২ শতাংশ।
শুধু পাঁচ দেশই নয়, আরও কয়েকটি দেশ থেকে উল্লেখযোগ্য অর্থ এসেছে। ওমান, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, সিঙ্গাপুর ও ইতালি—এই ছয় দেশ থেকে ১১ মাসে এসেছে প্রায় ৮৮৯ কোটি ডলার, যা মোট রেমিট্যান্সের ২৭ শতাংশ। সব মিলিয়ে ১১টি দেশই মোট আয়ের ৯০ শতাংশের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত অর্থবছরের প্রথম ১০ মাস ধরে এককভাবে রেমিট্যান্সের শীর্ষ উৎস ছিল সৌদি আরব। তবে মে মাসে এই চিত্র বদলে যায়। গত মে মাসে মোট ৩৪৪ কোটি ২৫ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে দেশে। এর মধ্যে যুক্তরাজ্য পাঠিয়েছে সবচেয়ে বেশি ৬৫ কোটি ৯ লাখ ডলার। দ্বিতীয় স্থানে থাকা সৌদি আরব থেকে ৫৪ কোটি ৬৫ লাখ ডলার, আর তৃতীয় স্থানে থাকা ইউএই থেকে ৪৬ কোটি ৮১ লাখ ডলার এসেছে। উল্লেখ্য, অর্থবছরের শুরুর মাস জুলাইয়ে যুক্তরাজ্য থেকে এসেছিল মাত্র ২৮ কোটি ২৫ লাখ ডলার, যা মে মাসে ১৩০ শতাংশ বেড়ে ৬৫ কোটি ডলারে পৌঁছায়। জুন মাসের হিসাব এখনো প্রকাশ করেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
প্রবাসীদের ব্যাংকিং চ্যানেলে আয় পাঠাতে উৎসাহিত করতে সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যাংকিং মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠালে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আগের তুলনায় এ প্রক্রিয়াও সহজতর করা হয়েছে। এর ইতিবাচক ফল হিসেবে হুন্ডির মতো অবৈধ মাধ্যম থেকে সরে আসার প্রবণতা বাড়ছে। তবে আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মতে, মোট রেমিট্যান্সের প্রায় তিন-পঞ্চমাংশ মাত্র পাঁচটি দেশের ওপর নির্ভর করা অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য সংবেদনশীল। তাঁদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অদক্ষ ও আধা-দক্ষ শ্রমিকের প্রাচুর্য থাকায় সেখানকার রেমিট্যান্প্রবাহ সবসময় স্থিতিশীল থাকে না। অন্যদিকে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী প্রবাসী বাংলাদেশিদের অর্থনৈতিক ভিত মজবুত হওয়ায় সেখান থেকে আয় স্থিতিশীল থাকে।
বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করে বলেন, প্রধান এই পাঁচ দেশের অর্থনৈতিক নীতি, ভূরাজনৈতিক অবস্থা বা শ্রমবাজারে বড় ধরনের যেকোনো পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের রেমিট্যান্সে। তার সরাসরি প্রভাব পড়বে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও। তাই এই নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া ও দূরপ্রাচ্যের নতুন শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে বলে তাঁরা মনে করেন।




