বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিষ্টি পানির হ্রদ ভিক্টোরিয়া, যা আফ্রিকা মহাদেশের বৃহত্তম। তানজানিয়া, উগান্ডা ও কেনিয়ার সীমান্তে প্রায় ৬৮ হাজার ৮০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই হ্রদের চারপাশের পাথুরে অঞ্চলে বাস করে এক বিশেষ ধরনের গিরগিটি। প্রথম নজরে এদের দেখতে সাধারণ মনে হলেও, এরা হঠাৎ করেই নিজেদের চেহারা বদলে ফেলতে পারে। এক মুহূর্তের মধ্যে মাথা, ঘাড় ও কাঁধ উজ্জ্বল লাল বা বেগুনি হয়ে যায়, আর শরীরের বাকি অংশ গাঢ় নীল বর্ণ ধারণ করে। এই রূপটি মার্ভেলের সুপারহিরো স্পাইডার-ম্যানের পোশাকের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় স্থানীয়ভাবে এটি ‘স্পাইডার-ম্যান আগামা’ নামে পরিচিত।

বৈজ্ঞানিকভাবে এদের নাম মওয়ানজা ফ্ল্যাট-হেডেড রক আগামা (Mwanza flat-headed rock agama)। এরা নিজেদের ইচ্ছামতো শরীরের রং বদলাতে সক্ষম এবং কখন এই রঙিন রূপ ধারণ করবে, তা নিজেরাই নির্ধারণ করে। গিরগিটির ত্বকে ‘ক্রোমাটোফোর’ নামের বিশেষ কোষ থাকে। ২০১৬ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, এই কোষের ভেতরে রঞ্জক পদার্থ জমা থাকে। গিরগিটি খুব দ্রুত এই রং এক জায়গায় জমাট বাঁধাতে পারে অথবা কোষের ওপর ছড়িয়ে দিতে পারে। যখন রং জমাট বাঁধে, তখন ত্বক হালকা বাদামি বা ধূসর দেখায়। আর যখন রং কোষের চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে, তখন শরীরের সেই অংশ উজ্জ্বল লাল, কমলা বা নীল হয়ে ওঠে। এই প্রক্রিয়ায় নতুন কোনো রং তৈরি করতে হয় না; স্নায়ুতন্ত্র ও হরমোনের মাধ্যমে পুরোনো রং ছড়িয়ে দিলেই রূপ বদলে যায়। তাই সাপ বা অন্য প্রাণীর তুলনায়, যেখানে ঋতুভেদে রং বদলাতে কয়েক সপ্তাহ লাগে, সেখানে এই গিরগিটি মাত্র কয়েক সেকেন্ডে পুরো চেহারা পাল্টে ফেলতে পারে।

স্পাইডার-ম্যানের মতো উজ্জ্বল রং সব গিরগিটির থাকে না। স্ত্রী গিরগিটি সবসময় হালকা বাদামি রঙের হয়। পুরুষদের মধ্যেও কেবল প্রভাবশালী পুরুষই লাল-নীল রং ধারণ করতে পারে। যারা দুর্বল, তারা নিজেদের বাঁচাতে অনুজ্জ্বল রঙেই থাকে। মূলত সঙ্গীকে আকর্ষণ করা এবং শত্রুকে ভয় দেখানোর জন্যই এরা এই রূপ ধারণ করে। পাথরের এমন জায়গা, যেখানে সবচেয়ে সুন্দর রোদ পড়ে, সেটি দখলের জন্য প্রতিযোগিতা হয়। উজ্জ্বল রং ফুটিয়েই প্রভাবশালী গিরগিটি অন্যকে জানিয়ে দেয়, এই এলাকা তার দখলে। এতে সরাসরি মারামারি এড়ানো যায়। যদি কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী সামনে আসে, তবে তারা মাথা ঝাঁকিয়ে বা শরীর উঁচিয়ে পুশ আপের মতো ভঙ্গি করে শক্তি প্রদর্শন করে। এভাবে রক্তপাত ছাড়াই শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হয়।

তবে এই রঙিন রূপের ঝুঁকিও আছে। উজ্জ্বল লাল-নীল রঙের কারণে বাজপাখির মতো শিকারি পাখিরা এদের দূর থেকে সহজেই দেখে ফেলে। ২০১৯ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ রঙের গিরগিটির তুলনায় এই উজ্জ্বল রূপের গিরগিটির ওপর শিকারিরা বেশি আক্রমণ চালায়। জীবনের ঝুঁকির কারণেই এরা সব সময় এই স্পাইডার-ম্যান রূপ ধরে রাখে না। সন্ধ্যা নামলে বা বিপদ টের পেলেই এরা দ্রুত সাধারণ বাদামি রঙে ফিরে যায়। মূলত নিজের এলাকা রক্ষার প্রয়োজনেই কেবল এরা স্পাইডার-ম্যান সাজে, বাকি সময় নিরাপদ থাকতে লুকিয়ে রাখে নিজেদের রূপ।

সাধারণ গিরগিটির মতো এরা শত্রুর হাত থেকে বাঁচতে বা মেজাজ অনুযায়ী রং বদলায় না। এদের স্বাভাবিক বাদামি রংই হলো আসল ছদ্মবেশ, যা দিয়ে পাথরের সঙ্গে মিশে থাকে। আর লাল-নীল উজ্জ্বল রূপটি ইচ্ছা করেই ধারণ করে সবার নজর টানতে। স্পাইডার-ম্যানের মতো দেখতে হওয়ায় এই গিরগিটি সামাজিক মাধ্যমে বেশ জনপ্রিয়। বিশেষ করে স্পাইডার-ম্যান সিনেমা মুক্তি পেলেই এরা ভাইরাল হয়। সূত্র: ফোর্বস।