মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের কর্মীদের এবার নিজেদের ভূমিকা বদলে ফেলতে বললেন এলন মাস্ক। রকেট নির্মাতা হিসেবে নয়, বরং কোম্পানির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সিস্টেমের অভিভাবক হিসেবে নিজেদের ভাবতে বলেছেন বিশ্বের শীর্ষ ধনী এই উদ্যোক্তা। সম্প্রতি এক সর্ব-কর্মী সভায় মাস্ক ঘোষণা করেন, স্পেসএক্সের 'সমগ্র তথ্যভাণ্ডার' ব্যবহার করে প্রশিক্ষিত হবে তাদের নিজস্ব এআই মডেল গ্রক। এই তথ্যের মধ্যে কর্মীদের কাজ ও অবদানও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
মঙ্গলবার সকালে স্পেসএক্সের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ সভার ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়। সেখানে মাস্ক কর্মীদের বলেন, 'আপনারা কার্যত এআইয়ের পিতা-মাতা হয়ে যাবেন', কারণ গ্রক তাদের 'চিন্তা, ধারণা ও বিশ্বাস' উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করবে। তিনি যুক্তি দেখিয়ে বলেন, স্পেসএক্সের ইঞ্জিনিয়ারিং টিম বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী; তাদের সম্মিলিত জ্ঞান আরও সক্ষম একটি এআই সিস্টেম গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
তবে ঠিক কোন ধরনের কর্মী তথ্য ব্যবহার করা হবে, তা এখনো প্রকাশ্যে বিস্তারিত জানানো হয়নি। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্পেসএক্সের অভ্যন্তরীণ তথ্য ও কর্মীদের অবদান এই পরিকল্পনার আওতায় পড়বে, কিন্তু কোন তথ্য অন্তর্ভুক্ত হবে বা কর্মীদের ডেটা কীভাবে সামলানো হবে, সে বিষয়ে কোম্পানির পক্ষ থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। সভায় মাস্ক কর্মীদের গ্রকের পরিচয় গঠনে অবদানকারী হিসেবে বর্ণনা করেন এবং বলেন, প্রশিক্ষণের ফলে যে মডেল তৈরি হবে, তা তৈরিতে যারা অংশ নিয়েছে তাদের কাছ থেকে কিছু উত্তরাধিকারসূত্রে পাবে। 'একভাবে বলতে গেলে, আপনাদের ওপরই প্রশিক্ষিত হবে এটি', বলেছিলেন মাস্ক। খবর লেখা পর্যন্ত স্পেসএক্সের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেওয়া হয়নি।
কর্মীদের তথ্য ব্যবহার করে এআই প্রশিক্ষণের ঘটনা এই প্রথম নয়। গত এপ্রিলে মেটা 'মডেল ক্যাপাবিলিটি ইনিশিয়েটিভ' নামে একটি কর্মসূচি চালু করেছিল, যার আওতায় কর্মীদের মাউস মুভমেন্ট, ক্লিক, কিবোর্ড প্রেস ও স্ক্রিনশট সংগ্রহ করা হতো। উদ্দেশ্য ছিল, মানুষ যেভাবে কম্পিউটার ব্যবহার করে ও কর্মক্ষেত্রের কাজ করে, সেভাবে এআই এজেন্টদের শেখানো। মেটা জানিয়েছিল, এসব তথ্য কর্মীদের কর্মমূল্যায়নে ব্যবহার করা হবে না এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে কোম্পানিটির ভেতরে প্রতিক্রিয়া ছিল উৎসাহব্যঞ্জক নয়; প্রায় ১,৬০০ কর্মী গোপনীয়তার উদ্বেগে এই ট্র্যাকিংয়ের বিরুদ্ধে একটি আবেদনে স্বাক্ষর করেন।
মাস্ক অবশ্য অনেক বেশি আশাবাদী। ভিডিওতে তিনি বলেছেন, সেপ্টেম্বরের মধ্যেই এআই থেকে আয় স্পেসএক্সের অন্যান্য সব ব্যবসার মোট আয়কে ছাড়িয়ে যেতে পারে। তিনি ধারণা দেন, ১০ গিগাওয়াট এআই কম্পিউটিং ক্ষমতা থেকে বার্ষিক ৩০০ থেকে ৫০০ বিলিয়ন ডলার আয় সম্ভব। বর্তমানে স্পেসএক্সের এআই কম্পিউটিং ক্ষমতা প্রায় ১.৪ গিগাওয়াট, যা ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ ১০ গিগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
সভায় মাস্ক স্টারলিংকের ব্যাপ্তিও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১৬৭টি দেশে এখন এই স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা চালু রয়েছে এবং মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ২২ মিলিয়ন। উল্লেখ্য, জুন মাসে স্পেসএক্স পাবলিক লিস্টিংয়ে যায়, যেখানে ৫৫৫.৫৬ মিলিয়ন শেয়ার বিক্রি করে প্রায় ৭৫ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা হয়। আইপিও নথিতে স্পষ্ট বলা ছিল, এই অর্থ কোম্পানির প্রবৃদ্ধি কৌশল বাস্তবায়নে, বিশেষ করে এআই কম্পিউটিং অবকাঠামো সম্প্রসারণে ব্যবহৃত হবে। পাবলিক কোম্পানি হিসেবে প্রথম ত্রৈমাসিকের আয়ের প্রতিবেদনে স্পেসএক্স প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফল দেখিয়েছে। প্রথম আয় কলেই বোঝা গেছে, মাস্ক তার স্পেসএক্স দলকে কী চোখে দেখেন। তিনি আগেই বলেছিলেন, কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য এআই অবকাঠামো নির্মাণ একটি সহজ কাজ। ডেটা সেন্টার তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার সময় তিনি এই চ্যালেঞ্জকে 'নিউ ইয়র্ক ইয়াঙ্কিজের ছোট লিগ দলের বিপক্ষে খেলার' সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।




