সরকার ১৮ জন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর পুলিশ এসকর্ট সুবিধা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এখন থেকে রাজধানীর সড়কে চলাচলের সময় এঁদের গাড়িবহরের সামনে পুলিশের প্রটোকল গাড়ি থাকবে না। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায়ে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনায় ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করে। পুলিশের যানবাহনের স্বল্পতা, জ্বালানির অপচয় রোধ এবং প্রটোকলের আকার ছোট করার সরকারি নীতিমালার আলোকেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর আগে প্রধানমন্ত্রী নিজেও তার প্রটোকল কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেন।

বর্তমান মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রীকে বাদ দিলে ২৪ জন পূর্ণমন্ত্রী, ২৩ জন প্রতিমন্ত্রী এবং বিভিন্ন পর্যায়ের উপদেষ্টা রয়েছেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে যে ১৮ জন মন্ত্রীর এসকর্ট প্রত্যাহার করা হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আহমেদ আজম খান, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, শ্রম ও প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং কৃষি ও মৎস্যমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।

এছাড়া তালিকায় রয়েছেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।

সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়নের পরও রাজধানীতে ছয়জন পূর্ণমন্ত্রী ও একজন উপদেষ্টা তাদের এসকর্ট সুবিধা ধরে রেখেছেন। তারা হলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ; অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী; সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন; পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এবং মন্ত্রী পদমর্যাদার পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

ডিএমপির প্রটেকশন বিভাগের বরাত দিয়ে জানা গেছে, এই এসকর্ট সুবিধার আওতায় থাকা মানে হল ব্যক্তির গাড়িবাহিনীর সামনে বা পাশে একটি পুলিশি সুরক্ষা বাহিনীর গাড়ি চলাচল করবে। সাধারণত প্রতিটি এসকর্ট দলে পাঁচ সদস্যের একটি পুলিশ টিম থাকে, যার নেতৃত্বে একজন উপপরিদর্শক ও চারজন কনস্টেবল থাকেন। তাদের যাতায়াতের জন্যে পুলিশের একটি গাড়ি বরাদ্দ দেওয়া হয়, এবং পুরো খরচ বহন করে রাষ্ট্রীয় কোষাগার।

এসকর্ট সুবিধা প্রত্যাহার হওয়া সত্ত্বেও মন্ত্রীদের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা প্রত্যাহার করা হয়নি। ডি.এম.পি'র বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁদের একদি গানম্যান ও বাড়ির নিরাপত্তা প্রহরী বহাল থাকবেন। পাশাপাশি রাজধানীর বাইরে কোনো সরকারি সফরে গেলে যথানিয়মে স্থানীয় পুলিশের প্রহরা ও অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগের মতোই প্রদান করা হবে।

এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে পুলিশ বাহিনীর মধ্যে থাকা তীব্র সংকট একটি বড় কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। ঢাকায় অবস্থিত অত্যাবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তায় যেই সংখ্যাক পুলিশ সদস্যের প্রয়োজন, তা বর্তমানে নেই। সদস্যের ঘাটতির দরুণ অতিরিক্ত সময় ডিউটি করার কারণে পুলিশ সদস্যদের ওপর বাড়তি শারীরিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। যানবাহনের সংকটও প্রকট। প্রায়শই একটি প্রটেকশন গাড়ি একজন মন্ত্রীর কাজ সেরে দ্রুত গিয়ে আরেকজনের দায়িত্ব নিতে বাধ্য হয়।

এই পুণর্বিন্যাসের ফলে মন্ত্রীদের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমানো সম্ভব হয়েছে। আগে এই কাজে প্রায় ১২০ জন পুলিশ সদস্য যুক্ত থাকলেও এখন এই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৩০ থেকে ৩৫ জনে। একই সঙ্গে, এই স্কর্টের জন্য ব্যবহৃত গাড়ির সংখ্যা ২৫টি থেকে কমিয়ে ৭টিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। এই খাত থেকে মুক্ত গাড়ি এবং জনবল পুলিশের অন্য কাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

ডিএমপির প্রটেকশন বিভাগের উপ-কমিশনার মো. শাহরিয়ার আলম একটি গণমাধ্যমকে বলেন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা প্রদান পুলিশের রুটিন কাজের অংশ। তবে কিছু সংকটের কারণে এই দায়িত্ব পালনে বাহিনীকে যথেষ্ট কাঠখর পোড়াতে হচ্ছে। সংকট দূর হলে আরও নিশ্চিত করে ও স্বচ্ছন্দে নিরাপত্তা সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।

উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে সুরক্ষা প্রদানের জন্য মূল আইন হলো বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী (এসএসএফ) আইন, ২০২১। এতে বলা হয়েছে, এসএসএফ এই দুই শীর্ষ পদাধিকারীর দৈহিক নিরাপত্তার জন্য সর্বক্ষণ এবং সর্বস্থানে দায়িত্বশীল। প্রধানমন্ত্রী নিজের প্রটোকল গাড়ির বহর ইতোমধ্যেই কমিয়ে আনায়, এখন তার বহরে পুলিশের পক্ষ থেকে কেবলমাত্র মোটর শোভাযাত্রার পাইলট (মোটরসাইকেলযোগে) রাখা হয়েছে। সামনে ও পেছনে দুইজন করে মোট চারজন পুলিশ সদস্য দায়িত্বে থাকেন।