গাজা উপত্যকার মধ্যাঞ্চলের দেইর আল-বালাহ শহরের একটি বালুময় পথে নীল, হলুদ ও সাদা রঙের ফুটবল নিয়ে হাঁটছিল ১৪ বছর বয়সী কারাম। দুই ভাই ও এক বোনের সঙ্গে বাস্তুচ্যুত এই কিশোর সিএনএনকে জানায়, ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন তার ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। ‘যুদ্ধের আগের জীবনটা দারুণ ছিল। এখন আর কোনো জীবন নেই,’— মন্তব্য করে সে। একসময়ের নীল সমুদ্রের মিতালি এখন আগুনে পোড়া খেত, ছাই হয়ে যাওয়া বাগান আর ভগ্নস্তূপের পাহাড়ে রূপ নিয়েছে। যুদ্ধ কেবল স্থাপনাই ধ্বংস করেনি, পুরো ভূপ্রকৃতিই পাল্টে দিয়েছে।

ওয়াশিংটন ও তেহরান যখন সাময়িক যুদ্ধবিরতিকে টেকসই শান্তিতে পরিণত করার প্রয়াস চালাচ্ছে, তখনই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম গাজার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেছে। বাস্তুচ্যুত এই মানুষগুলোর অনেকেই মার্কিন-সমর্থিত সমঝোতাটিকে আরেকটি ব্যর্থ ও অর্থহীন চুক্তি বলে মনে করছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার জেরে ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় অভিযান শুরু করে। দীর্ঘ দুই বছর বোমাবর্ষণ ও অবরোধের পর গত শরতে দুই ধাপের একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পাদিত হলেও তার ভবিষ্যৎ শুরুতেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েন এবং নতুন ফিলিস্তিনি প্রশাসন গঠনের কথা থাকলেও উভয় পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে।

যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরের আট মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও মাঠপর্যায়ে অগ্রগতি খুবই সীমিত। জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তা নিকোলাই ম্লাদেনভ মে মাসে সতর্ক করে বলেছিলেন, গাজার মানুষ এখন ‘বিপজ্জনক অচলাবস্থার’ মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গঠিত বোর্ড অব পিস সম্প্রতি সাইপ্রাসে তাদের বৈঠককে ‘অত্যন্ত ফলপ্রসূ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে, কিন্তু পরবর্তী পদক্ষেপের কোনো স্পষ্ট রূপরেখা প্রকাশিত হয়নি। হামাস প্রস্তাবিত ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট কমিটির দায়িত্ব গ্রহণের কোনো সময়সূচি জানায়নি, এবং নিরাপত্তার জন্য যে আন্তর্জাতিক বাহিনীর কথা বলা হয়েছিল, তারও কোনো বাস্তব অস্তিত্ব এখনো দেখা যায়নি।

ইতোমধ্যে ইসরায়েল গাজায় নিজেদের সামরিক অবস্থান আরও মজবুত করেছে। ‘ইয়েলো লাইন’-এর বাইরেও দখল সম্প্রসারিত হয়েছে এবং হামাস সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান রয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত মাসে জানিয়েছেন, তিনি সেনাবাহিনীকে গাজার ৭০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং প্রয়োজনে আরও বড় অংশ দখল করা হতে পারে। বিপরীতে, হামাসও তাদের সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠিত করেছে, অস্ত্র সমর্পণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং গাজার অভ্যন্তরে নিজেদের কর্তৃত্ব আরও জোরদার করেছে।

ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যের বরাতে সিএনএনের পরিসংখ্যান বলছে, গত ১১ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ২১ জুন পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় কমপক্ষে ১ হাজার ৫৯ জন নিহত ও ৩ হাজার ৪২৯ জন আহত হয়েছেন। ওই সময়ে গাজায় গড়ে প্রতিদিন একজন করে শিশু প্রাণ হারিয়েছে। জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনের জুন মাসের প্রতিবেদনে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের ওপর জাতিগত নিধন চালাতে শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ আনা হয়েছে, যদিও ইসরায়েল তা প্রত্যাখ্যান করেছে।

বাস্তুচ্যুত ত্রাণকর্মী সালি সালেহ বলেন, ‘এখানে প্রকৃত কোনো যুদ্ধবিরতি নেই। যেকোনো মুহূর্তে, যেকোনো স্থানে বোমা হামলা হতে পারে।’ জাতিসংঘের মতে, গাজার প্রায় ১৯ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত। তাদের অনেককে একাধিকবার আশ্রয় বদলাতে হয়েছে। এসব অস্থায়ী তাঁবুতে বাতাস চলাচলের সুবিধা না থাকায় ত্বকের র্যাশ ও পরজীবী সংক্রমণ দ্রুত ছড়াচ্ছে। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ইঁদুর, তেলাপোকা ও বেজির আক্রমণে। এরা তাঁবুর কাপড় ছিঁড়ে ভেতরে ঢুকে ঘুমন্ত শিশুদের, এমনকি নবজাতকদেরও কামড়াচ্ছে।

মেডিক্যাল এইড ফর প্যালেস্টিনিয়ানস (এমএপি)-এর জরুরি কার্যক্রমের প্রধান সালি সালেহ অভিভাবকদের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন, যাদের সন্তানদের ইঁদুর কামড়েছে এবং তারা বারবার এমন ঘটনার আশঙ্কা করছেন। গাজা সিটির পানি সরবরাহ কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র হুসনি নাদিম মোহান্না জানিয়েছেন, শৌচাগারের তীব্র সংকটে মানুষ গর্ত খুঁড়তে বাধ্য হওয়ায় মাটি ও পানি দূষিত হচ্ছে। ইঁদুর ত্রাণের প্যাকেট কেটে ফেলায় অনেকে অল্প মজুত থাকা চাল-আটা ফেলে দিচ্ছেন, কেউ কেউ খাবার বাঁচাতে তা ছাদ থেকে ঝুলিয়ে রাখছেন।

ইসরায়েল সরকার গত মাসে জাতিসংঘের সহায়তায় বড় পরিসরে ইঁদুর ও কীটপতঙ্গ দমন অভিযানের কথা জানালেও মানবাধিকার সংস্থাগুলো এ ত্রাণকে পর্যাপ্ত মনে করছে না। তাদের অভিযোগ, জেনারেটর ও খুচরা যন্ত্রাংশের মতো জরুরি সামগ্রী প্রবেশে ইসরায়েলের কড়াকড়ি এবং ত্রাণকর্মীরা হামলায় নিহত হওয়ার কারণে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সালি সালেহর মতে, এসব বিধিনিষেধের কারণে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহসহ নানাবিধ কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ায় গাজার মানুষের ওপর চাপ ও ভোগান্তি ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।