১৮৩৩ সালের ২০ জুলাই, নদিয়া জেলার কুমারখালী মহকুমার কুন্ডুপাড়া গ্রামে এক তিলি পরিবারে হরিনাথ মজুমদারের জন্ম হয়েছিল। পিতা হলধর মজুমদার ও মাতা কমলিনী দেবীর একমাত্র সন্তান তিনি শৈশবে পিতামাতৃবিয়োগের ত্রাসদী সহন করেন। ছয় মাস বয়সে মা হারান এবং সাত বছর বয়সে পিতাকেও হারিয়ে অনাথ ও অসহায় হয়ে পড়েন। বৃদ্ধা খুল্লপিতামহীর প্রতিপালনে বয়সকাল কাটিয়েও দারিদ্র্যের গভীর দাগ মনেও باقی থাকে, ফলে তিনি পরে নিজের নামের সাথে 'কাঙাল' উপ لقب যোগ করেন।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দারিদ্র্যের কারণে অসম্পূর্ণ থাকেও হরিনাথ স্বশিক্ষার পথ অবলম্বন করেন। কুমারখালীর ব্রাহ্মধর্ম প্রचारক দয়ালচাঁদ শিরোমণির সান্নিধ্যে বাংলা ব্যাকরণ শিখেন এবং তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা, বিদ্যাসাগরের বেতাল পঞ্চবিংশতি, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সংবাদ প্রভাকর পড়ে গদ্যশৈলী ও ভাষাজ্ঞান সমৃদ্ধ করেন। এই স্বশিক্ষাই পরবর্তীকালে তাঁকে বলিষ্ঠ লেখক ও গ্রামীণ বুদ্ধিজীবী হিসেবে গড়ে তোলে।

জীবিকা আনয়নের জন্য ১২ বছর বয়সে কাপড় দোকানে চাকরি, পুথি নকল এবং নীলকুঠিতে শিক্ষানবিশি হিসেবে কাজ করেন। নীলকুঠিতে ব্রিটিশ শাসক ও জমিদাররা কৃষকদের ওপর কি ধরনের অত্যাচার করতেন তা নিজের চোখে দেখে তাঁর ন্যায়নিষ্ঠ মন বিচলিত হয়। কৃষকদের শোষণের প্রতিবাদে চাকরি ছাড়িয়ে তিনি নিজেকে সাধারণ রায়তদের একজন হিসেবে বিলিয়ে দেন।

শিক্ষাই সমাজপরিবর্তনের একমাত্র উপায় বলে মনে করে ১৮৫৫ সালের ১৩ জানুয়ারি নিজ গ্রামে অবৈতনিক 'ভার্নাকুলার স্কুল' প্রতিষ্ঠা করেন। আপweiler বছর ২৩ ডিসেম্বর কৃষ্ণধন মজুমদারের সহযোগিতায় কুমারখালীতে একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন, যা বর্তমান কুমারখালী পাইলট বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এটি 당시 পূর্ববঙ্গের প্রথম ও অবিভক্ত বাংলার তৃতীয় নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

কলকাতাকেন্দ্রিক অভিজাত সাংবাদিকতার বাইরে গ্রামবাংলার কণ্ঠস্বর এনে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ১৮৬৩ সালের এপ্রিল মাসে 'গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা' নামক মাসিক পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন। পরবর্তীতে এটি পাক্ষিক এবং ১৮৭১ সালে এক পয়সা মূল্যের সাপ্তাহিকী রূপ নেয়। পাবনার তत্কালীন ম্যাজিস্ট্রেট স্যার হামফ্রের 의해 একজন বিধবা নারীর গাভি জবরদস্তি আনার ঘটনা 'গরুচোর ম্যাজিস্ট্রেট' শিরোনামে প্রতিবেদন করে তিনি সাহসী সাংবাদিকতার পরিচয় দেন।

মুদ্রণজটিলতা দূর করতে ১৮৭৩ সালে বাল্যবন্ধু মথুরানাথ মজুমদারের স্মৃতিতে 'মথুরানাথ প্রেস' স্থাপন করেন, যা পূর্ববঙ্গের প্রথম প্রকাশনী। এই প্রেস থেকে মীর মশাররফ হোসেনের 'বিষাদ-সিন্ধু', লালন শাহের বাউল গান এবং তাঁর নিজস্ব গ্রন্থাবলী মুদ্রিত হয়।

১৮৮০ সালে সাংবাদিকতা ছেড়ে আধ্যাত্মিক শান্তির জন্য 'কাঙাল ফকির চাঁদের দল' নামক বাউল দল 꾸রী করেন। 'ফকির চাঁদ বাউল' ছদ্মনামে প্রায় এক হাজার বাউল গান রচনা করে হাটে-ঘাটে-মাঠে গেয়ে بেড়ান। বিজয়-বসন্ত, পদ্মপুণ্ডরিক, চারুচরিত্র, কবিতা কৌমুদী, কাঙাল-ফকিরচাঁদ ফকীরের গীতাবলী সহ অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করেন।

দীর্ঘ অভাব-অনটন ও শারীরিক অসুস্থতায় ১৮৯৬ সালের ১৬ এপ্রিল (৫ বৈশাখ ১৩০৩) ৬৩ বছর বয়সে কুমারখালীর কাঙাল কুটিরে তিনি পরলোকগমন করেন। তৎকালীন 'ইন্ডিয়ান মিরর' পত্রিকা তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে নদিয়া জেলাবাসীদের একজন মহান ও নিঃস্বার্থ সন্তান হারানোর কথা লেখে। আজও কাঙাল হরিনাথের জীবন ও কর্ম গ্রামীণ সাংবাদিকতা, নারীশিক্ষা ও সামাজিক সংস্কারের প্রেরণার উৎস।