কিংবদন্তি ব্রুস লি। বিশ্ব চলচ্চিত্র ও মার্শাল আর্টে যার প্রভাব আজও অমলিন। ১৯৭৩ সালের ২০ জুলাই মাত্র ৩২ বছর বয়সে মস্তিষ্কের রোগে আক্রান্ত হয়ে হংকংয়ে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। সেই সময় তিনি 'এন্টার দ্য ড্রাগন' ছবির কাজ শেষ করেছেন মাত্র। মুক্তির পর ছবিটি বিশ্বব্যাপী কুংফু উন্মাদনা সৃষ্টি করে এবং তাকে করে তোলে চিরস্থায়ী আইকন।

১৯৪০ সালের ২৭ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে জন্ম ব্রুস লির। মা গ্রেস তাকে 'ইউমেন ক্যাম' নামে ডাকতে চেয়েছিলেন, কিন্তু হাসপাতালের নার্স উচ্চারণ করতে না পেরে জন্ম সনদে লিখে ফেলেন 'ব্রুস লি'। নামটি থেকেই যায়। জন্মের কিছুদিন পর বাবা লি হুই চোয়েন পরিবার নিয়ে হংকং ফিরে যান। ক্যান্টনিজ অপেরা শিল্পী বাবার কারণে ছোটবেলা থেকেই সিনেমার পরিবেশে বেড়ে ওঠেন ব্রুস। মাত্র ৬ বছর বয়সে 'দ্য বিগিনিং অব আ বয়' ছবির মাধ্যমে তার চলচ্চিত্রে অভিষেক হয়।

পর্দার বাইরের জীবন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। হংকংয়ের রাস্তায় তিনি দল বেধে মারামারি করতেন। শরীর ছিল হালকা-পাতলা, তাই শক্তিশালী প্রতিপক্ষের কাছে প্রায়ই মার খেতেন। এই অপমান ও ব্যর্থতাই তাকে মার্শাল আর্টের পথে ঠেলে দেয়। তিনি উইং চুন কুংফু শেখা শুরু করেন। ধীরে ধীরে তার শরীর ও মনোবল বদলে যায়। স্কুলে পড়ার সময় এক শিক্ষক তাকে শাসাতে বক্সিং রিংয়ে ডাকেন। ব্রুস তার উইং চুন কৌশল দিয়ে শিক্ষককে পরাস্ত করেন। বিস্মিত শিক্ষক তাকে স্কুল বক্সিং দলে ভর্তি করে নেন। সেই বছরই আন্তঃবিদ্যালয় চ্যাম্পিয়নকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হন তিনি। এসময় তিনি চা-চা নৃত্যেও চ্যাম্পিয়ন হন, যা পরবর্তীকালে তার মার্শাল আর্টের ছন্দ ও গতিকে আরও উন্নত করে।

এক মারামারির ঘটনায় পুলিশ গ্রেপ্তার করলে পরিবার তাকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে দেয়। সিয়াটলে পড়াশোনার পাশাপাশি কঠোর অর্থকষ্টের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। সেখানেই তিনি কুংফু শেখানো শুরু করেন এবং নিজের দর্শন 'জিৎ কুনে দো' গঠন করেন। তার ছাত্রী লিন্ডা এমেরির সাথে ১৯৬৪ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৬৫ সালে জন্ম হয় পুত্র ব্র্যান্ডন লির।

হলিউডে তিনি স্টিভ ম্যাককুইন, জেমস কোবার্ন ও বাস্কেটবল তারকা করিম আবদুল জব্বারের মতো সেলিব্রিটিদের মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণ দিতেন। কিন্তু অভিনয়ের বড় সুযোগ আসেনি। 'দ্য গ্রিন হর্নেট' সিরিজে কেটো চরিত্রে অভিনয় করলেও তাকে মূলধারার নায়ক হিসেবে গ্রহণ করেনি হলিউড। 'কুং ফু' সিরিজে এশীয় চরিত্রে শ্বেতাঙ্গ অভিনেতা ডেভিড ক্যারাডাইনকে নেওয়া হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি নিজের পথ তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন।

১৯৭০ সালের শেষ দিকে হংকংয়ে ফিরে প্রযোজক রেমন্ড চোয়ের গোল্ডেন হার্ভেস্ট স্টুডিওর সাথে কাজ শুরু করেন। ১৯৭১ সালে 'দ্য বিগ বস' মুক্তি পায় এবং হংকংয়ের বক্স অফিসের সব রেকর্ড ভেঙে দেয়। ১৯৭২ সালে 'দ্য চায়নিজ কানেকশন' (ফিস্ট অব ফিউরি) আরও বড় সাফল্য আনে। একই বছর তিনি নিজের পরিচালনায় 'ওয়ে অব দ্য ড্রাগন' তৈরি করেন, যেখানে চাক নরিসের সাথে রোমান কলোসিয়ামের লড়াই এখনও অ্যাকশন সিনেমার ইতিহাসে ক্লাসিক হিসেবে বিবেচিত।

মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে ব্রুস লি এশিয়ার সেরা তারকা হয়ে ওঠেন। কিন্তু ক্রমাগত কাজের চাপ, অনিদ্রা ও শরীরের প্রতি অতিরিক্ত চাপ তাকে ভিতর থেকে দুর্বল করে ফেলেছিল। ১৯৭৩ সালের মে মাসে ডাবিংয়ের সময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসকেরা তার মস্তিষ্কে সেরিব্রাল এডিমা ধরা পড়ে। তিনি সুস্থ হয়ে উঠলেও ২০ জুলাই হঠাৎ মাথাব্যথা শুরু হলে ব্যথানাশক ওষুধ খেয়ে শুয়ে পড়েন; আর উঠেননি। তার মৃত্যু বিশ্বজুড়ে শোকের ছায়া ফেলে দেয়। হংকংয়ে তার শেষকৃত্যে লাখো মানুষ অংশ নেয়।

ব্রুস লির মৃত্যুর পর 'এন্টার দ্য ড্রাগন' মুক্তি পায় এবং বিশ্বব্যাপী কুংফু উন্মাদনা সৃষ্টি করে। টাইম ম্যাগাজিন তাকে ২০ শতকের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। তার তৈরি 'জিৎ কুনে দো' দর্শন আজও মার্শাল আর্টিস্ট ও দার্শনিকদের অনুপ্রাণিত করে। একজন এশীয় হিসেবে তিনি পশ্চিমা সংস্কৃতিতে নিজের শরীর ও দর্শনকে প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন।