বাংলাদেশে মাইক্রোড্রামা নির্মাণের উদ্যোগ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। সম্প্রতি ‘সিলভার সাদিয়া’ নামের একটি মাইক্রোড্রামা মুক্তি পেয়েছে, যেখানে অভিনয় করেছেন সাদিয়া আয়মান, অ্যালেন শুভ্র, ফারজানা ছবি ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর রাফসান দ্য ছোট ভাই। ১৫ পর্বের এই ড্রামার প্রতিটি পর্বের দৈর্ঘ্য তিন মিনিট। গল্পে উঠে এসেছে নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের এক মাদ্রাসাপড়ুয়া তরুণীর জীবন, যার ভেতরে গোপনে বেড়ে উঠেছিল গেমিংয়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা। এর নির্মাতা মিরাজ হোসেন মনে করেন, এ ধরনের কনটেন্টের জন্য দর্শককে আগে অভ্যস্ত করাতে প্রচুর পরিমাণে কনটেন্ট প্রয়োজন। তাঁর ভাষ্য, সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও মাইক্রোড্রামার বড় বাজার রয়েছে, তবে সেটা কাজে লাগাতে প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ।

শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বব্যাপী মাইক্রোড্রামা বিনোদন মাধ্যমটির প্রভাব বাড়ছে। চীনে এই খাতের বাজারমূল্য এখন সাড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার, যা দেশটির পুরো চলচ্চিত্র বক্স অফিসের আয়কেও ছাড়িয়ে গেছে। ২০২০ সালে যার বাজার ছিল মাত্র ১ বিলিয়ন ইউয়ান, ২০২৫ সালের মধ্যে তা ১০০ বিলিয়ন ইউয়ান অতিক্রম করে। চলতি বছর তা ১২০ বিলিয়ন ইউয়ানে পৌঁছাতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। প্রায় ৬৬ কোটি ব্যবহারকারী নিয়ে চীনের এই শিল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এখন ব্যাপক। দর্শকের পছন্দ বিশ্লেষণ, গল্পের ধারণা তৈরি, চিত্রনাট্যের খসড়া, ডাবিং ও অনুবাদ—সবকিছুতেই এআই ব্যবহৃত হচ্ছে। এমনকি চীনের ন্যাশনাল রেডিও অ্যান্ড টেলিভিশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এই শিল্পের জন্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাও চালু করেছে।

মাইক্রোড্রামার কাঠামো অত্যন্ত সুসংহত। একটি সিরিজে সাধারণত ৮০ থেকে ১০০টি পর্ব থাকে, প্রতিটি পর্বের দৈর্ঘ্য এক থেকে দুই মিনিট। সম্পূর্ণ গল্প তৈরি করা হয় মুঠোফোনের ৯:১৬ ভার্টিক্যাল স্ক্রিনের কথা মাথায় রেখে। প্রতিটি পর্ব শেষ হয় ক্লিফহ্যাঙ্গার কৌশলে, যা দর্শককে পরের পর্ব দেখতে আগ্রহী করে তোলে। প্রথাগত টেলিভিশন সিরিজ বা সিনেমা যেখানে কয়েক মাস সময় নেয়, সেখানে অনেক মাইক্রোড্রামা মাত্র ৭ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে লেখা, শুটিং ও সম্পাদনা শেষ করে মুক্তি দেওয়া হয়। চীনে ‘শুডিয়ান’ নামে বিশেষ ইনডোর স্টুডিও গড়ে উঠেছে, যেখানে একই ভবনের ভেতরে হাসপাতাল, অফিস, রেস্তোরাঁ, বাড়ি—নানা ধরনের সেট রয়েছে, ফলে ইউনিটের স্থানান্তরের ঝামেলা কমে যায়।

ভারতেও মাইক্রোড্রামা দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করছে। বিনিয়োগ সংস্থা লুমিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে এই বাজারের আকার ৩০ কোটি ডলার, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ৪৫০ কোটি ডলারে পৌঁছতে পারে। ভারতে এই ট্রেন্ড শুরু হয় ২০২৪ সালের দিকে, কুকু ও রিলাইজের মতো স্টার্টআপের মাধ্যমে। জি এন্টারটেইনমেন্ট এন্টারপ্রাইজেজ ও বালাজি টেলিফিল্মস ইতিমধ্যে মাইক্রোড্রামা তৈরিতে অংশীদারত্ব ঘোষণা করেছে। মুকেশ আম্বানির জিওস্টার ‘তাড়কা’ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে, যেখানে শতাধিক শো রয়েছে। যশরাজ ফিল্মস ও রেড চিলিজ ইন্টারটেইনমেন্টের মতো বড় প্রতিষ্ঠানও বিনিয়োগের কথা ভাবছে বলে শোনা যাচ্ছে। ভারতে একটি ৫০ পর্বের মাইক্রোড্রামা বানাতে খরচ হয় প্রায় ১০ থেকে ১৫ লাখ রুপি। ক্লিপের প্রধান নির্বাহী ভিকি বাহরি জানান, তারা বাজেট বাড়িয়ে ২০ থেকে ৪০ লাখ রুপি করছেন এবং পরিচিত অভিনেতাদের যুক্ত করছেন।

বাংলাদেশেও দীপ্ত প্লের মাধ্যমেবৃহৎ পরিসরে মাইক্রোড্রামা বিতরণ শুরু হয়েছে। প্ল্যাটফর্মটি এই বছর ‘অসমাপ্ত সম্পর্ক’ নামে একটি চীনা মাইক্রোড্রামার বাংলা ডাব মুক্তি দিয়েছে, যা আসলে ‘লাভ রিউনিয়ন: দ্য ম্যারিড মাদার্স টেল’ নামে পরিচিত। এরপর আরও তিনটি চীনা মাইক্রোড্রামা বাংলা ডাবে প্রকাশিত হয়েছে। দীপ্ত প্লের হেড অব ডিজিটাল মোহাম্মদ আবু নাসিম জানান, টিকটক ও ফেসবুক রিলসের জনপ্রিয়তা ধরেই মাইক্রোড্রামা তৈরি হয়েছে, তাই বাংলাদেশও এই খাতে ভালো করবে। তিনি বলেন, তারা চীনা কনটেন্টের অ্যাডাপটেশনের মাধ্যমে দর্শকের পছন্দ বোঝার চেষ্টা করছেন এবং খুব শিগগির মৌলিক মাইক্রোড্রামা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। তবে তিনি চ্যালেঞ্জের কথাও উল্লেখ করেন—দেড় থেকে দুই মিনিটের মধ্যে দর্শককে ধরে রাখা এবং ভার্টিক্যাল স্ক্রিনের সীমাবদ্ধতা মোকাবিলা করা।

নির্মাতা আদনান আল রাজীব মনে করেন, মাইক্রোড্রামার জনপ্রিয়তা বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়বে। দর্শকদের মধ্যে মনোযোগের সময় কমে আসায় ছোট কনটেন্টের চাহিদা বাড়ছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, টিকটক বা রিলসের মতো ছোট ভিডিও আর মাইক্রোড্রামা এক জিনিস নয়। মাইক্রোড্রামায় একটি পূর্ণাঙ্গ গল্প থাকে, যেখানে ভালো শুরু ও হুক পয়েন্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, সামনে বাংলাদেশেও মাইক্রোড্রামাভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল বা প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠতে পারে। এই ধারার কনটেন্টে জটিল গল্পের বদলে পরিচিত ফর্মুলা বেশি কাজ করে—যেমন সাধারণ মানুষ হঠাৎ ধনী হওয়া, প্রতিশোধ, প্রেম ও পারিবারিক দ্বন্দ্ব, লুকিয়ে থাকা পরিচয় ইত্যাদি। একসময় এসব গল্পকে একঘেয়ে বলা হলেও বড় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ও অভিজ্ঞ পরিচালকদের অংশগ্রহণে নির্মাণমান অনেক উন্নত হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।