কলেজের ছুটিতে ঘুরতে গিয়ে প্রাণনাশের ঝুঁকিতে পড়েছিলেন চার তরুণ। বান্দরবানের থানচি উপজেলার নাফাখুম ও অমিয়াখুম ঝরনা দেখতে গিয়ে টানা ভারী বর্ষণে তাঁরা নয় দিন ধরে পাহাড়ে আটকা পড়েছিলেন। গত ৪ জুলাই অমিয়াখুমে যাওয়ার পথে থুইসাপাড়ায় বৃষ্টিতে ফেরার পথ ডুবে গেলে স্থানীয় এক পাহাড়ি পরিবারের জুমঘরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন আবু হুরায়রা, মারুফ উদ্দিন, তামিম রায়হান ও মাহাদি আল মাহবুব। প্রাথমিকভাবে দ্রুত ফেরার আশা থাকলেও টানা বৃষ্টিতে তা সম্ভব হয়নি। সেখানেই তাদের কাটাতে হয় টানা সাত দিন।
ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী এই চার বন্ধু ২ জুলাই বান্দরবান সদর থেকে ১১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত নাফাখুমের উদ্দেশে রওনা হন। বর্ষাকালে নদীপথ ও দুর্গম পাহাড়ি ট্রেইল পাড়ি দিয়ে ৩ জুলাই তারা সেখানে পৌঁছান। পরদিন স্থানীয় গাইড শিমন খিয়াংকে নিয়ে অমিয়াখুমের পথ ধরলেও বিকেলে শুরু হয় অতিভারী বর্ষণ। থুইসাপাড়ায় গাইডের পরিচিত এক পরিবারের বাঁশের মাচাংয়ের ঘরে আশ্রয় নেন তারা। মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক না থাকায় পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ না দেখে চার বন্ধু উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। ৬ ও ৮ জুলাই কাছের জিন্নাপাড়ায় একটি ব্যক্তিগত স্টারলিংক ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করে পরিবারের সাথে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য যোগাযোগ করেন হুরায়রা ও মাহাদি। তারা শুধু জানান, 'আমরা বেঁচে আছি, থুইসাপাড়ায় আটকে পড়েছি।' এদিকে স্থানীয় পাহাড়ি পরিবার তাদের আতিথেয়তায় কোনো ত্রুটি রাখেনি। ভাত, ডাল ও পাহাড়ি খাবার দিয়ে তাদের সাহায্য করা হয়। টাকাও নেননি কেউ।
৯ জুলাই ট্যুর গাইডের মাধ্যমে জানতে পারেন থুইসাপাড়ায় বিজিবির ক্যাম্প রয়েছে। হুরায়রা ও মাহাদি সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি জানান। বিজিবি সদস্যরা তাদের নিরাপদ স্থানে অবস্থানের পরামর্শ দেন। পরদিন পরিচয় যাচাই করে তারা আশ্বস্ত করেন, আবহাওয়া অনুকূলে এলে উদ্ধার অভিযান চালানো হবে। এর মধ্যেই পাশের একটি ১৪ সদস্যের পর্যটক দল নিখোঁজ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে, যা পরে নিরাপদে ফেরার খবর পাওয়া যায়।
অবশেষে ১১ জুলাই আবহাওয়া কিছুটা ভালো হলে ১০ সদস্যের বিজিবি দল উদ্ধার অভিযান শুরু করে। মূল পথ পানির নিচে থাকায় বিকল্প দুর্গম পথে এগোতে হয়। ভূমিধস, খাড়া ঢাল ও উত্তাল নদী পেরিয়ে প্রথম দিন শেষে একটি পাহাড়ি পাড়ায় রাত কাটান। ১২ জুলাই আবার যাত্রা শুরু করে সারা দিন দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে সাকা হাফং-সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছান। সেখান থেকে বিজিবির গাড়িতে থানচিতে ফেরেন। দীর্ঘ নয় দিন পর মোবাইল নেটওয়ার্ক ফিরে পান তারা।
থানচি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কানন সরকার বলেন, 'থানচিতে আসা চার পর্যটকের তথ্য থানায় নিবন্ধিত ছিল। টানা বৃষ্টিতে সাঙ্গু নদীর স্রোত তীব্র থাকায় তারা ফেরত আসতে পারেনি। বিজিবি ও উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে ধাপে ধাপে তাদের উদ্ধার করে নিরাপদে থানচিতে আনা হয়।' থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ-আল-ফয়সাল বলেন, 'বৃষ্টির কারণে নদীর পানি বেড়ে প্রবল স্রোত সৃষ্টি হয়েছিল, ফলে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের সরিয়ে আনা যায়নি। পরে জেলা প্রশাসন ও মন্ত্রীর নির্দেশনায় ৩৮ বিজিবির সহায়তায় উদ্ধারকাজ সম্পন্ন হয়। স্থানীয় গাইড শিমন খিয়াং ও পাড়াবাসীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।'
আবু হুরায়রা জানান, 'শুরুতে এটি ছিল সাধারণ এক ভ্রমণ। কিন্তু টানা বৃষ্টি ও যোগাযোগহীনতা একে জীবনের অন্যতম ভয়াবহ অভিজ্ঞতায় রূপ দিয়েছিল। স্থানীয় বাসিন্দা ও বিজিবি সদস্যদের আন্তরিকতা না থাকলে আমরা নিরাপদে ফিরতে পারতাম না। বান্দরবানের এই নয় দিন আমাদের স্মৃতিতে চিরকাল থাকবে।' বর্তমানে সবাই সুস্থ থাকলেও মানসিকভাবে তারা এখনো স্বাভাবিক হতে পারেননি। পরিবার থেকে তাদের তিনজনকে এসব নিয়ে কারও সাথে কথা না বলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।




