বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুবার্ষিকী এবার অনেকটাই নিভৃতেই পার হয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্ত না থাকায় তা জানতে পারেননি লেখকভক্ত অনেকেই। তবে দুইটি প্রধান সংবাদপত্র নিয়মিত পড়া সত্ত্বেও সেখানে তেমন কোনো বিশেষ আয়োজন বা প্রতিবেদন চোখে পড়েনি বলে জানিয়েছেন একাধিক পাঠক। যা কিছু খবর প্রকাশিত হয়েছে, তাও হতাশাজনক বলে মনে করছেন অনেকে।
রোববার দুপুরে গাজীপুরের নুহাশপল্লীতে হুমায়ূন আহমেদের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান তাঁর স্ত্রী অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন। এ সময় তিনি অভিমান করে বলেন, সরকার বা রাষ্ট্রের কাছ থেকে কোনো কিছুই তিনি চান না। হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন বা মৃত্যুবার্ষিকী পালনের জন্য কখনোই কারও কাছে কিছু চাননি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এই বক্তব্যে আবারও উঠে এসেছে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অভাবের প্রসঙ্গ।
হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির তুলনামূলক সাহিত্যের গবেষক নীলিমা ইসলাম বলেন, তিনি অত্যন্ত সরল ভাষায় গভীর কথা বলতে জানতেন। তাঁর ভাষা সহজ হলেও চোস্ত। এ কারণেই বিভিন্ন পটভূমি থেকে আসা পাঠক নিজের মতো করে তাঁর লেখা উপভোগ করতে পারেন। গল্প বলার ধরনও প্রশংসাযোগ্য ছিল। বাস্তবতা ও রহস্যময়তাকে তিনি অনায়াসে মেলাতে পারতেন। অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃত বিষয়গুলোকে তিনি বিস্ময়করভাবে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতেন।
সাহিত্যের অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম ‘হুমায়ূন আহমেদ পাঠপদ্ধতি ও তাৎপর্য’ বইয়ে লিখেছেন, নিজ অস্তিত্বের সম্প্রসারণ হিসেবে নাগরিক শিক্ষিত মধ্যবিত্তের দৈনন্দিনতাকে আবিষ্কার করতে পারার বিপুল সাফল্যই হুমায়ূনের নজিরবিহীন জনপ্রিয়তার কারণ। তাঁর রচনাবলি থেকে কিছু টেক্সট বাছাই করা সম্ভব, যা প্রভাবশালী সাহিত্যপাঠরীতি অনুযায়ী পঠিত হতে পারে।
হুমায়ূন আহমেদ শুধু সাহিত্যিকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন বড় মাপের নির্মাতা। তাঁর নির্মিত নাটক ও চলচ্চিত্র যেমন ‘আগুনের পরশমণি’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘চন্দ্রকথা’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘নয় নম্বর বিপদ সংকেত’, ‘আমার আছে জল’, ‘ঘেটু পুত্র কমলা’ এখনো দর্শকপ্রিয়। তাঁর লেখার ওপর ভিত্তি করে অন্য চলচ্চিত্রকাররাও ছবি তৈরি করেছেন। বাংলাদেশিদের একসময়ের সবচেয়ে বড় বিনোদন ছিল তাঁর নাটক। পরিবারের সব সদস্য একত্রে বসে তাঁর নাটক দেখার রীতি এখনো আছে। টেলিভিশন থেকে সেটা এখন ইউটিউবে স্থানান্তর হয়েছে।
তিনি অসংখ্য গান রচনা করেছেন, যা তাঁর নাটক ও চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। সেই সব গান গেয়েছেন দেশের স্বনামধন্য শিল্পীরা। এ ছাড়া বাংলাদেশের একমাত্র স্যাটায়ার ম্যাগাজিন ‘উন্মাদ’–এ নিয়মিত লিখতেন ‘এলেবেলে’ শিরোনামে। ব্যক্তি হুমায়ূন আরও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ঢাকার অদূরে নুহাশপল্লী নামে নির্মাণ করেছেন বাগানবাড়ি। তাঁর মায়ের পরামর্শে ২০০৬ সালে নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার রোয়াইলবাড়ী আমতলা ইউনিয়নে শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠ নামে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন। প্রতিষ্ঠানটি স্থাপিত হওয়ার পর থেকে এসএসসিতে অংশ নেওয়া প্রায় শতভাগ শিক্ষার্থী ভালো ফল অর্জন করছে।
এক সময় হুমায়ূন আহমেদের লেখা নিয়ে সমালোচনা না করলে লেখক হওয়ার স্বীকৃতি পাওয়া যেত না। অনেকেই এখনো সেটা করেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাঁর লেখা না পড়েই। তবে এখনো সর্বাধিক বিক্রীত বইয়ের তালিকায় হুমায়ূন আহমেদের বই আছে বলে দাবি করেন অনেকে। ইনস্টাগ্রামে এখনকার তরুণ-তরুণীদের হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে আগ্রহ দেখে ভালো লাগে। নতুন প্রজন্ম যারা তাঁকে দেখেনি, তারা তাঁর লেখা পড়ে রিভিউ দেয়। বৃষ্টি এলেই এখনো অনেকে তাঁকে স্মরণ করে। হলুদ পাঞ্জাবি ও নীল শাড়ি পরে শহরের রাস্তায় হাঁটার চল এখনো আছে।
লেখক সম্পর্কে একজন ভক্ত বলেন, তিনি পাঠ্যবইয়ের বাইরের বই পড়তে শিখেছেন হুমায়ূন আহমেদের গল্পের বই পড়ে। তাঁর বই পড়তে গিয়ে আরও অনেক বইয়ের রেফারেন্স পেয়েছেন। ছোটবেলায় গ্রাম্য ভাষায় শোনা সম্বোধন ও প্রবাদগুলো শহরে এসে গালি বলে গণ্য হতো। হুমায়ূন আহমেদ খুবই স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেগুলো তাঁর লেখায় ফিরিয়ে এনেছিলেন।
সবমিলিয়ে, হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুবার্ষিকী এবার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে নিভৃতেই কেটেছে। তাঁর স্ত্রীর ক্ষোভের মধ্যে দিয়ে আবারও প্রমাণিত হয়েছে, যে দেশে গুণীর কদর নেই, সে দেশে গুণী জন্মায় না বলে মন্তব্য করেছেন অনেকে। তবে নতুন প্রজন্মের মধ্যে তাঁর প্রতি আগ্রহ দেখে আশা করা যায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সৃষ্টির বহুবিধ মূল্যায়ন হবে।




