বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক নির্দেশনা অনুযায়ী, আমানত ও ঋণের সুদহারের ব্যবধান বা স্প্রেড এখন সর্বোচ্চ ৪ শতাংশের মধ্যে রাখতে হবে। এই ঘোষণার পর দেশের ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি (এসএমই) খাতে ঋণদানকারী ব্যাংকগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের বক্তব্য, এই খাতে ঋণের পরিচালন ব্যয় অত্যন্ত বেশি, যা মাত্র ৪ শতাংশ স্প্রেডের মধ্যে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিলে ব্যাংকগুলোর গড় আমানতের সুদহার ছিল ৬ দশমিক ২৪ শতাংশ, অপরদিকে ঋণের গড় সুদহার দাঁড়িয়েছিল ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশে। তখন স্প্রেড ছিল ৫ দশমিক ৭২ শতাংশ। নতুন শর্ত অনুযায়ী এই ব্যবধান কমিয়ে আনতে হবে, যার ফলে অনেক ব্যাংককে তাদের ঋণের সুদহার কমাতে বাধ্য হতে হবে। তবে ক্রেডিট কার্ড ও ভোক্তা ঋণের ক্ষেত্রে এই নিয়ম কার্যকর হবে না।

এসএমই খাতে শীর্ষ ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর তালিকায় রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক, দি সিটি ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক ও ইউসিবি। এসব ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ছোট উদ্যোক্তাদের কাছে ঋণের সুদহারের চেয়ে ঋণ পাওয়াটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাদের ধারণা, অধিক মুনাফার কারণে উচ্চ সুদহারেও এই উদ্যোক্তারা ঋণ নিতে রাজি থাকেন। কিন্তু ঋণপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে এই প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

ব্যাংকগুলোর বর্তমান সুদহার পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ব্র্যাক ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংক ১৪ শতাংশ এবং প্রাইম ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও ইউসিবি ১৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদে ঋণ দিচ্ছে। ফলে নতুন স্প্রেড নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে হলে পর্ষদগুলোকে তাদের সুদহারে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাধারণ সম্পাদক ও ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান জামান চৌধুরী বলেন, ব্যবসার খরচ কমানোর লক্ষ্যে স্প্রেড ৪ শতাংশ নির্ধারণ একটি ভালো উদ্যোগ। এতে সব ব্যবসায়ী সমান হারে ঋণ পাবেন এবং দেশের অর্থনীতি উপকৃত হবে। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, এই পদক্ষেপে অনেক ব্যাংক চাপের মুখে পড়বে এবং তাদের মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

অন্যদিকে, ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান জানান, ব্যাংকটির গড় ব্যয়-আয় অনুপাত ৪৫ শতাংশ হলেও সিএমএসএমই খাতে তা বেড়ে ৬৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই খাতে ঋণ প্রদানের খরচ অনেক বেশি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যাংকের মোট জনবলের অর্ধেকই এই খাতের জন্য নিবেদিত। মাত্র ৪ শতাংশ স্প্রেড দিয়ে এই খাতের পরিচালন ব্যয় মেটানো অত্যন্ত কঠিন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সরকারের পক্ষ থেকে সুদহার নমনীয় করার নির্দেশনা থাকলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত কোনো পর্যালোচনা ছাড়াই নেওয়া হয়েছে বলে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার সময় এমন সিদ্ধান্ত আরও যাচাই-বাছাই করে নেওয়া উচিত ছিল।

উল্লেখ্য, দেশের ব্যাংক খাতের মোট ঋণের প্রায় ১৮ শতাংশ এখন কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতে বিতরণ করা হয়। ২০২৯ সালের মধ্যে এই হার ২৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। বর্তমানে দেশে ১ কোটি ১৭ লাখ সিএমএসএমই প্রতিষ্ঠান রয়েছে; তবে এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ উদ্যোক্তা প্রথাগত ব্যাংকঋণের আওতার বাইরে রয়েছেন।

এমতাবস্থায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন স্প্রেড নির্ধারণের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য এবিবির পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চিঠি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ব্যাংকাররা আশা প্রকাশ করেছেন, দেশের এসএমই খাতের স্বার্থে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।