সাম্প্রতিক সময়ে ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের পরীক্ষামূলক এআই এজেন্ট কোনো নির্দেশনা ছাড়াই ইন্টারনেট ব্যবহার করে অন্য প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করেছে—এই ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও গ্রাহকদের তথ্য ফাঁস হয়নি, তবু এআইয়ের সক্ষমতা কীভাবে সাইবার হামলায় ব্যবহৃত হতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা তীব্র হয়েছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই জানিয়েছে, গত বছর এআই-সম্পর্কিত অপরাধে দেশটিতে ভুক্তভোগীরা ৮৯ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বেশি অর্থ হারিয়েছেন।

সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্রাউডস্ট্রাইকের ২০২৬ সালের ‘থ্রেট হান্টিং’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যবসায়িক কার্যক্রম দ্রুততর করতে ব্যবহৃত এআই মডেল, স্বয়ংক্রিয় টুল ও লার্জ ল্যাংগুয়েজ মডেলের (এলএলএম) ব্যবহার যত বাড়ছে, হামলার ঝুঁকিও তত বিস্তৃত হচ্ছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, করপোরেট নেটওয়ার্কের বিস্তার, নতুন ডিভাইসের সংযোগ এবং বিভিন্ন কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অন্তর্ভুক্তির ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো অজান্তেই এমন ডিজিটাল পরিসর তৈরি করছে, যেখানে নিরাপত্তার ফাঁক থেকে যাচ্ছে। এসব দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে হামলাকারীরা তথ্য চুরি, এআই মডেলে অননুমোদিত প্রবেশ, নজরদারি অথবা নিজেদের প্রয়োজনে বিভিন্ন কাজ করতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কোনো সফটওয়্যারের দুর্বলতা প্রকাশ হওয়ার পর হামলা চালানোর সময় দ্রুত কমে আসছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ক্রাউডস্ট্রাইক যে হামলাগুলো শনাক্ত করেছে, তার ৮৮ শতাংশই কোনো দুর্বলতার পরীক্ষামূলক কোড বা প্রুফ অব কনসেপ্ট (পিওসি) প্রকাশের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শুরু হয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানো এখন আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ক্রিস হোয়াইটের মতে, সাইবার অপরাধীদের হাতে এআই এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সহজলভ্য, সস্তা ও কার্যকর একটি হাতিয়ার। এর ফলে প্রতারণার কৌশলও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। শুধু প্রযুক্তিগত হামলাই নয়, সামাজিক প্রকৌশলের মাধ্যমেও অপরাধীরা নতুন মাত্রা যোগ করছে।

এই ধরনের প্রতারণা থেকে নিরাপদ থাকতে বিশেষজ্ঞরা চারটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রথমত, ডিপফেক ভিডিও চেনার কৌশল জানা জরুরি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ডেটা অ্যানালিটিকস প্রতিষ্ঠান গ্যালাপের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর দেশটিতে প্রতারণার শিকার হওয়া প্রায় ১২ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে হওয়া প্রতারণায় এআই বা ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছিল। মাইক্রোসফট টিমস বা জুমের মতো প্ল্যাটফর্মেও নকল ভিডিও ব্যবহার সম্ভব। তারকা, প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বা পরিচিত ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তিদের মুখ নকল করে প্রতারণা চালানো হচ্ছে। তবে এসব নকল ভিডিও সবসময় নিখুঁত হয় না। ভিডিও কলে থাকা ব্যক্তির পরিচয় নিয়ে সন্দেহ হলে তাঁকে মাথা ঘোরাতে বা দাঁড়িয়ে ঘুরতে বলা যেতে পারে। ক্যামেরার সামনে নড়াচড়া করলে কৃত্রিম মুখের অসংগতি ধরা পড়ে। এছাড়া কেউ যদি টাকা, ব্যাংক হিসাবের তথ্য বা অনলাইন অ্যাকাউন্টে প্রবেশের অনুমতি চান, তাহলে সরাসরি বিশ্বাস না করে পরিচিত ও নির্ভরযোগ্য মাধ্যমে অনুরোধটি যাচাই করে নিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, নকল কণ্ঠস্বর শনাক্ত করার ক্ষমতা বাড়াতে হবে। এআই দিয়ে এখন মানুষের কণ্ঠস্বর অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নকল করা যায়। অপরাধীরা পরিবারের সদস্য বা ঘনিষ্ঠজন সেজে বিপদে পড়ার কথা বলে দ্রুত টাকা দাবি করে। ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক লরেল কুক জানান, মানুষ যেন ভয় বা উৎকণ্ঠার মধ্যে পড়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়, প্রতারকেরা ঠিক সেই সুযোগই কাজে লাগায়। এফবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর এই কৌশলে ভুক্তভোগীরা ৫০ লাখ ডলারের বেশি হারিয়েছেন। অধ্যাপক ক্রিস হোয়াইট আরও জানান, মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ভয়েস নমুনা থেকেই এআই ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত মিল থাকা কণ্ঠস্বর তৈরি করতে পারে। অথচ সাধারণ মানুষ মাত্র ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রে এটি কৃত্রিম কি না, তা ধরতে পারেন। ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তির পরিচয় নিয়ে সন্দেহ হলে কলটি কেটে দিয়ে পরিচিত বা নির্ভরযোগ্য অন্য নম্বরে যোগাযোগ করতে হবে।

তৃতীয়ত, পাসওয়ার্ড সুরক্ষায় নতুন কৌশল অবলম্বন করতে হবে। এআই এখন পাসওয়ার্ড সরাসরি ভাঙার চেয়ে ফাঁস হওয়া পাসওয়ার্ড ও ব্যক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য পাসওয়ার্ড অনুমান করতে বেশি পটু। ইউনিভার্সিটি অব বাফেলোর পরিচালক সিওয়ে লিউ জানান, ফাঁস হওয়া পাসওয়ার্ডের ধরন দেখে এআই খুব দ্রুত সম্ভাব্য পাসওয়ার্ড তৈরি করে ফেলে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা অন্তত ১২ অক্ষরের দীর্ঘ পাসওয়ার্ড ব্যবহারের পাশাপাশি মাল্টি ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন ব্যবস্থা চালু করার পরামর্শ দিয়েছেন। পাসকি ও পাসওয়ার্ড ব্যবস্থাপনার সফটওয়্যার ব্যবহারও নিরাপদ। উল্লেখ্য, পাসওয়ার্ডে একটি বড় হাতের অক্ষর, একটি সংখ্যা ও একটি বিশেষ চিহ্ন থাকার নির্দিষ্ট নিয়ম অনেক সময় হ্যাকারদের জন্য অনুমানের কাজ সহজ করে দিতে পারে। এর পরিবর্তে কবিতার কোনো লাইন বা সহজে মনে রাখা যায়, এমন দীর্ঘ বাক্য পাসওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

চতুর্থত, ভুয়া ক্যাপচা ও ক্ষতিকর অ্যাপ থেকে সতর্ক থাকতে হবে। অনলাইন প্রতারণার নতুন কৌশল হলো ভুয়া ক্যাপচা। সাধারণ ক্যাপচায় কোনো ঘরে টিক দিতে বা ছবি মেলাতে বলা হয়। কিন্তু ভুয়া ক্যাপচায় কম্পিউটারে কোনো কমান্ড বা নির্দেশ লিখতে, সফটওয়্যার ডাউনলোড করতে বা নিরাপত্তা সেটিংস পরিবর্তন করতে বলা হয়। এসব নির্দেশ মানলে অজান্তেই ক্ষতিকর সফটওয়্যার (ম্যালওয়্যার) ইনস্টল হয়ে যায়। এছাড়া ক্ষতিকর অ্যাপকে ই-মেইল, কন্টাক্ট লিস্ট বা ফাইলের অনুমতি দিলে ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হতে পারে। এজন্য গুগল বা মাইক্রোসফট অ্যাকাউন্টে কোন কোন অ্যাপ যুক্ত আছে, তা নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের সিকিউরিটি সেটিংস থেকে অন্য কোনো অজানা ডিভাইসে অ্যাকাউন্ট লগইন করা আছে কি না, তা যাচাই করতে হবে। এই প্রতিবেদনটি জেডডিনেট ও স্ক্রিপসনিউজের তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে।