বিমান চলাচল খাতে পরিবেশ দূষণ কমাতে যুগান্তকারী এক উদ্যোগ নিয়েছে ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা এয়ারবাস। প্রতিষ্ঠানটি জার্মানির ইঞ্জিন প্রস্তুতকারক এমটিইউ অ্যারো ইঞ্জিনসের সাথে একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। তাদের লক্ষ্য এমন একটি প্রোপালশন সিস্টেম তৈরি করা যা সম্পূর্ণরূপে হাইড্রোজেন ফুয়েল সেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে চলবে। এই প্রযুক্তি বর্তমানে ব্যবহৃত জীবাশ্ম জ্বালানি-নির্ভর জেট ইঞ্জিনের বিকল্প হিসেবে কাজ করবে এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের পাশাপাশি নাইট্রোজেন অক্সাইডের মতো ক্ষতিকর গ্যাস নির্গমন পুরোপুরি শূন্যে নামিয়ে আনবে বলে দাবি করা হচ্ছে।

চুক্তি অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন সাপেক্ষে ২০২৭ সালের মধ্যে একটি যৌথ প্রতিষ্ঠান গঠন করে পূর্ণাঙ্গ গবেষণা ও উন্নয়ন কাজ শুরু হবে। এয়ারবাসের 'জিরো-ই' প্রকল্পের অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত বছর প্যারিস এয়ার শোতে উভয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল; বর্তমান চুক্তি সেটিরই চূড়ান্ত রূপ।

এই নতুন ইঞ্জিনের কার্যপ্রণালী প্রচলিত ইঞ্জিনের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফুয়েল সেলের ভেতরে তরল হাইড্রোজেন ও বাতাসের অক্সিজেনের মধ্যে তড়িৎ-রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটানো হয়। এই প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎশক্তি উৎপন্ন হয়, যা লিথিয়াম ব্যাটারিগুলো চার্জ করে। ওই ব্যাটারির শক্তিতেই বিমানের মোটরগুলো পরিচালিত হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই বিক্রিয়ার উপজাত হিসেবে তৈরি হয় শুধু বিশুদ্ধ জলীয় বাষ্প। ফলে ইঞ্জিন থেকে কোনো কার্বন বা নাইট্রোজেন অক্সাইড নির্গত হবে না। তবে সালফার অক্সাইড তৈরির সম্ভাবনা আছে কিনা তা নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে।

এমটিইউ অ্যারো ইঞ্জিনসের ইঞ্জিনিয়ারিং ও টেকনোলজি বিষয়ক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট স্টেফান ওয়েবার জানান, তাদের মূল লক্ষ্য এমন একটি নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য এবং সাশ্রয়ী প্রোপালশন সিস্টেম তৈরি করা যা বিমান চলাচল খাতকে পুরোপুরি জলবায়ু-নিরপেক্ষ করে তুলবে। এয়ারবাসের মতে, বর্তমানে ব্যবহৃত টেকসই জ্বালানি (সাসটেইনেবল এভিয়েশন ফুয়েল) দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়, কারণ সেগুলো পোড়ালেও কিছু পরিমাণ ক্ষতিকর গ্যাস নির্গত হয়। অন্যদিকে তরল হাইড্রোজেন শক্তিতে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং ওজনে হালকা হওয়ায় এটি আদর্শ জ্বালানি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তবে এই প্রযুক্তি বাস্তবায়নে বেশ কিছু কঠিন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। হাইড্রোজেনকে তরল অবস্থায় রাখতে হলে তা শূন্যের নিচে প্রায় ২৫৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হয়। তাছাড়া সাধারণ জেট ফুয়েলের তুলনায় তরল হাইড্রোজেন অনেক বেশি জায়গা দখল করে। ফলে বিমানের অভ্যন্তরীণ নকশায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা জরুরি। বিশাল হাইড্রোজেন ট্যাংক বসানোর জন্য বর্তমান বিমানের কাঠামো যথেষ্ট নয়।

সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০৩৫ সালের মধ্যেই এয়ারবাস ও এমটিইউ-এর তৈরি প্রথম বাণিজ্যিক হাইড্রোজেন চালিত যাত্রীবাহী বিমান আকাশে উড়তে পারে। একইসাথে তারা হাইড্রোজেন এভিয়েশন ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার জন্যও কাজ করছে, যাতে ভবিষ্যতে বিশ্বের বিভিন্ন বিমানবন্দরে এই বিমানগুলো নিরাপদে জ্বালানি নিতে পারে।