উচ্চ মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে দীর্ঘদিন সংকোচনমূলক নীতি অনুসরণের পর অবশেষে নীতি সুদহারের কড়াকড়ি শিথিল করল বাংলাদেশ ব্যাংক। গতকাল অনুষ্ঠিত এক সভায় রেপো রেট ১০ শতাংশ থেকে হ্রাস করে ৯.৫০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী রোববার থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বক্তব্য, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির নানা সূচক পর্যালোচনা করেই এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
মনিটারি পলিসি কমিটির (এমপিসি) ১৩তম বৈঠকে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান সভাপতিত্ব করেন। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক উল্লেখ করে, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি খাতে ঋণের গতি, কর্মসংস্থান, প্রবৃদ্ধি ও বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যের সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করেই নীতি সুদহার কমানোর এই পদক্ষেপ নেওয়া হলো। এর ফলে তপশিলি ব্যাংকগুলোর জন্য তহবিল সংগ্রহ তুলনামূলক সাশ্রয়ী হবে, যা ধাপে ধাপে ঋণের সুদহার কমার পথ উন্মোচন করতে পারে। পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী এ প্রসঙ্গে জানান, আগে থেকেই সুদের হার নিম্নমুখী ছিল, বর্তমান সিদ্ধান্তের প্রভাবে এটি আরও কমবে। এক্ষেত্রে কিছু ব্যাংকে ঋণের সুদহার দশমিক ৫ শতাংশ থেকে শুরু করে ১ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে এবং পাশাপাশি আমানতের সুদেও প্রভাব পড়বে।
অর্থনীতিবিদরা অবশ্য এই সিদ্ধান্তের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি দিচ্ছেন। তাঁরা মনে করেন, টানা তেরো মাস ধরে ৯ শতাংশের উপরে থাকা মূল্যস্থিতির পেছনে সরবরাহজনিত কারণ, বাজারের অদক্ষতা ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বর্ধিত মূল্যই প্রধান দায়ী। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান সতর্ক করে বলেছেন, নীতি সুদহর কমানো এমন একটা ভুল বার্তা দিতে পারে যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এসে গেছে। অথচ বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা, বিনিময় হারের অস্থিরতা ও সরবরাহ জটিলতা অটুট থাকলে কম সুদের ফলে বর্ধিত চাহিদাই মূল্যস্ফীতি আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। তিনি আরও যোগ করেন, বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে শুধু সুদের হার কমানোই যথেষ্ট নয়; বরং রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খল পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও জ্বালানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করাই অধিক জরুরি।
একই সঙ্গে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করছেন, সুদহর কমালে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে না। কারণ, বাজারের ব্যবস্থাপনাই প্রকৃত সংকট। বরং কঠোর মুদ্রানীতির ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ একেবারে নিম্নমুখী হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত মে মাসে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪.৯৮% ছিল, যা দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। অন্যদিকে নতুন করে বিনিয়োগ বাড়ানো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই এই করণীয়কে গুরুত্ব দিচ্ছে। সরকার ২০৩৪ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করতে চায়।
উচ্চ সুদের কারণে ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনীহা ছিল। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান সুদহার কমানোর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে ভবিষ্যতে ধাপে ধাপে এটি আরও কমানোর প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। তাঁর কথায়, ব্যবসায় গতি ফেরাতে সুদের পাশাপাশি সামগ্রিক ব্যবসা সহজীকরণ প্রক্রিয়াও দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। এর আগে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রেক্ষিতে গভর্নর অস্থায়ীভাবে এই পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছিলেন। কিন্তু পরে বিগত ৩০ জুনের সংকোচনমূলক বাজেট ঘোষণার পর আবারও সুদ কমানোর বিষয়টি গুরুত্ব পায়।



