বল পায়ে লিওনেল মেসি নামলেই মাঠে যেন জাদু ছড়িয়ে পড়ে—চোখধাঁধানো ড্রিবল, নিখুঁত পাস আর মুহূর্তেই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক গোল। অনেকে মনে করেন এটি জন্মগত প্রতিভার ফল। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। ৩৯ বছর বয়সেও মেসি যে গতি, ভারসাম্য ও ক্ষিপ্রতা নিয়ে খেলছেন, তার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের কঠোর নিয়মানুবর্তিতা। শৈশবে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে হয়েছে তাঁকে, পাশাপাশি ক্যারিয়ারজুড়ে নানা চোটের সঙ্গেও লড়তে হয়েছে। তবে খাদ্যাভ্যাসে বড় পরিবর্তন, পরিকল্পিত অনুশীলন এবং শরীরের প্রতি যত্নই তাঁকে বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের একজন হিসেবে টিকে থাকতে সাহায্য করছে।
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে ফাস্ট ফুড, কোমল পানীয়, পিৎজা ও আর্জেন্টিনার জনপ্রিয় ভাজা খাবার ‘মিলানেসা’ ছিল মেসির অত্যন্ত প্রিয়। কিন্তু ক্যারিয়ারের মাঝামাঝি সময়ে তিনি বুঝতে পারেন, দীর্ঘদিন সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলতে শরীরের যত্ন নেওয়া জরুরি। ২০১৪ সালে মেসি ইতালীয় পুষ্টিবিদ জিউলিয়ানো পোজেরের সঙ্গে কাজ শুরু করেন। এরপরই তাঁর খাদ্যতালিকায় বড় পরিবর্তন আসে। পোজেরের পরিকল্পনার মূল ভিত্তি ছিল পাঁচটি উপাদান—প্রচুর পানি, অলিভ অয়েল, গোটা শস্য (হোল গ্রেইন), তাজা ফল এবং তাজা সবজি। এই খাবারগুলো শরীরের প্রদাহ কমাতে ও পেশি দ্রুত পুনরুদ্ধারে সহায়তা করে।
পুষ্টিবিদ পোজেরে বিশেষভাবে পরামর্শ দিয়েছিলেন চিনি এবং পরিশোধিত ময়দা যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে। তাঁর মতে, অতিরিক্ত চিনি পেশির জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর উপাদানগুলোর একটি। এছাড়া লাল মাংস খাওয়াও অনেক কমিয়ে দিয়েছেন মেসি, কারণ এটি হজমে ধীর এবং শরীরকে ভারী করে তোলে। ম্যাচের দিন যত ঘনিয়ে আসে, প্রোটিনের চাহিদা পূরণে মেসি দিনে তিনটি পর্যন্ত প্রোটিন শেক খান। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান করেন, যাতে শরীরে পানিশূন্যতা না হয়। কোমল পানীয় ছেড়ে মেসি বেছে নিয়েছেন ইয়ারবা মাতে—দক্ষিণ আমেরিকার জনপ্রিয় ক্যাফেইনসমৃদ্ধ ভেষজ চা। খাদ্যাভ্যাসের এই পরিবর্তনের পর দারুণ সুফল পেয়েছেন তিনি; এমনকি বড় ম্যাচের আগে যে বমি বমি ভাব তাঁকে দীর্ঘদিন ভোগাত, সেটিও অনেকটাই কমে গেছে। বর্তমানে ইন্টার মায়ামিতে খেলার সময়ও তিনি ক্লাবের পুষ্টিবিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনে চলেন। ম্যাচ শেষে দ্রুত শক্তি ফিরে পেতে খেলোয়াড়দের সাধারণত পাস্তা, সালাদ বা প্রোটিনসমৃদ্ধ সুশি খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। মৌসুম চলাকালে মদ্যপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
অনুশীলনের ক্ষেত্রে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো বা নেইমারের মতো ভারী ওজন তোলায় মেসির তেমন আগ্রহ নেই। তাঁর প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য তিনটি—গতি, কার্যকর শক্তি এবং নমনীয়তা। স্পেনে খেলার সময় প্রতিদিন এক ঘণ্টারও বেশি সময় স্ট্রেচিং করতেন মেসি, যা পেশি নমনীয় রাখে এবং চোটের ঝুঁকি কমায়। তাঁর অনুশীলন সাধারণত দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে থাকে সরলরৈখিক গতির ব্যায়াম—যেমন পিলার ব্রিজ, নি হাগ লাঞ্জ, হার্ডল হপ ও স্প্লিট স্কোয়াট জাম্প। এগুলো দ্রুত গতি বাড়াতে সাহায্য করে। দ্বিতীয় ভাগে থাকে বহুমুখী গতির অনুশীলন—যেমন পার্শ্বমুখী লাফ, থ্রি হার্ডল ড্রিল ও মিরর ড্রিল। এসব ব্যায়াম মাঠে মুহূর্তের মধ্যে দিক পরিবর্তন, ভারসাম্য ধরে রাখা এবং প্রতিপক্ষকে ফাঁকি দেওয়ার দক্ষতা বাড়ায়। মৌসুম চলাকালে সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন তিনি এ ধরনের অনুশীলন করেন।
মেসির উচ্চতা মাত্র ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি এবং ওজন প্রায় ৬৭ কেজি। অনেকেই একসময় এটিকে দুর্বলতা ভাবলেও, বাস্তবে এই ছোট গড়নই তাঁকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে। ‘লো সেন্টার অব গ্র্যাভিটি’ অর্থাৎ শরীরের ভরকেন্দ্র তুলনামূলক নিচে থাকায় মেসি প্রতিপক্ষের চাপের মধ্যেও ভারসাম্য হারান না এবং খুব দ্রুত দিক পরিবর্তন করতে পারেন। এ কারণেই ড্রিবলিংয়ে তিনি অনন্য।
সঠিক খাবার, নিয়মিত অনুশীলন, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং শরীরের প্রতি সচেতন যত্ন—এই চারটি বিষয় বছরের পর বছর মেনে চলছেন মেসি। এ কারণেই ৩৯ বছর বয়সেও তিনি বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের একজন হিসেবে মাঠ মাতিয়ে চলেছেন।

