রাতের আঁধারে চুরির পরিকল্পনা করতে গিয়ে খুন হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে নটর ডেম কলেজের অফিস সহকারী লিপিকা জুলিয়ানা গমেজের (৪০)। পুরান ঢাকার সূত্রাপুর এলাকার ভাড়া বাসার চারতলার ফ্ল্যাটে একাই থাকতেন তিনি। ২০২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে ছাদ থেকে রশি বেয়ে নেমে ভেন্টিলেটর ভেঙে ভেতরে ঢোকে নজরুল (২২)। দরজা খুলে দিলে ভেতরে প্রবেশ করে জুয়েল (২১)। লিপিকার ঘুম ভেঙে গেলে চিৎকার শুরু করলে লোহার পাইপের আঘাতে রক্তাক্ত হন তিনি। পরে বালিশ দিয়ে মাথা চেপে ধরায় তাঁর মৃত্যু হয়।

ঘটনার পরদিন সকালে কলেজে না যাওয়ায় সহকর্মীরা ফোন করলে সাড়া মেলে না। দুপুরে ফ্ল্যাটে ঢুকে রক্তাক্ত লাশ দেখতে পান তারা। এ ঘটনায় ১১ সেপ্টেম্বর সূত্রাপুর থানায় হত্যা মামলা করেন খালাতো ভাই প্রিন্স গমেজ। তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। মামলার ১২ দিন পর ২২ সেপ্টেম্বর দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২৫ সালের ৭ মে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন পিবিআইয়ের পরিদর্শক মমিনুল ইসলাম। বর্তমানে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা পর্যায়ে রয়েছে।

লিপিকার একা থাকার খবরটি জানতেন পাশের বাসার দারোয়ানের ছেলে জুয়েল। বাসা পরিবর্তনের সময় মজুরির বিনিময়ে কাজ করার সুবাদে এই তথ্য তাঁর জানা হয়ে যায়। সাত-আট বছরের পুরনো বন্ধু নজরুলকে বিষয়টি জানিয়ে চুরির পরিকল্পনা করেন জুয়েল। ঘটনার দুই দিন আগে ৯ সেপ্টেম্বর বাসার আশপাশ ঘুরে ঢোকার পথ নির্ধারণ করেন তাঁরা। ঘটনার রাতে আনুমানিক তিনটার দিকে নজরুল ছাদ থেকে রশির সাহায্যে নামেন এবং ভেন্টিলেটর ভেঙে ভেতরে ঢোকেন। মূল দরজা খুলে দিলে জুয়েলও প্রবেশ করেন। ঘরের জিনিস খোঁজার একপর্যায়ে লিপিকার ঘুম ভেঙে যায়। চিৎকার শুরু করলে নজরুল লোহার পাইপ দিয়ে মাথায় আঘাত করে। এরপর জুয়েল বালিশ দিয়ে মাথা চেপে ধরলে লিপিকার মৃত্যু হয়।

দুটি মুঠোফোন, একটি হাতব্যাগ ও কিছু গয়না নিয়ে বের হওয়ার সময় বাইরে থেকে দরজায় তালা লাগিয়ে দেন তারা। হাতব্যাগে থাকা ২৬ হাজার ৩৫০ টাকা দুজনে ভাগ করে নেন। সদরঘাট এলাকার দুই ব্যক্তির কাছে ফোন দুটি ৩ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করেন। গয়না মনে করে নেওয়া অলংকারগুলো পরে পরীক্ষায় ইমিটেশন হিসেবে ধরা পড়ে।

মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে তদন্ত চালিয়ে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় সদরঘাট ও সূত্রাপুর এলাকা থেকে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত প্লাস, দুটি স্ক্রু ড্রাইভার এবং লিপিকার চুরি হওয়া মালামাল উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন দুজন।

লিপিকার সহকর্মীরা খোঁজ করতে গিয়ে ফ্ল্যাট তালাবদ্ধ দেখতে পান। কেয়ারটেকার মিতুর কাছে ফ্ল্যাটের চাবি থাকায় দরজা খুলে ভেতরে ঢোকা হয়। ড্রয়িংরুমে আলো জ্বলতে দেখা যায় এবং উত্তর দিকের জানালার ভেন্টিলেটর ভাঙা অবস্থায় পাওয়া যায়। শয়নকক্ষে গিয়ে দেখা যায়, লিপিকা খাটের ওপর শুয়ে আছেন। মাথার বাঁ পাশে রক্তাক্ত জখম দেখে বোঝা যায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

লিপিকার খালাতো ভাই প্রিন্স গমেজ জানান, ১৯৯৪ সালে বিয়ে হলেও ২০০০ সালে বিচ্ছেদ ঘটে তাঁর। সন্তান না থাকায় ২০১৩ সাল থেকে ঠাকুরমার সঙ্গে থাকতেন। ঠাকুরমার মৃত্যুর পর একাই থাকতে শুরু করেন। পারিবারিকভাবে বিত্তশালী ছিলেন তিনি। ২০১৬ সালের মার্চে নটর ডেম কলেজে যোগ দেন।

জবানবন্দিতে জুয়েল জানায়, ঘটনার দিন ২০০ টাকায় নোস প্লায়ার্স কেনা হয়েছিল। লিপিকার মাথার কাছ থেকে দুল নেওয়ার সময় তাঁর ঘুম ভেঙে যায়। চিৎকার শুরু করলে নজরুল লাঠি দিয়ে আঘাত করে এবং জুয়েল বালিশ দিয়ে চেপে ধরে। টাকাপয়সা ভাগ করে রশিসহ কিছু জিনিস বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়া হয়। জুয়েলের দাবি, ২৬ হাজার টাকার মধ্যে সে ১৬ হাজার টাকা পেয়েছিল। মামলার বাদী প্রিন্স গমেজ জানান, প্রশাসনের সহযোগিতায় মামলার দ্রুত শুনানি হচ্ছে এবং এখন পর্যন্ত ২১ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।