আফ্রিকার কয়েকটি দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া শর্তযুক্ত স্বাস্থ্য সহায়তা প্রত্যাখ্যান করায় ট্রাম্প প্রশাসনের বৈশ্বিক স্বাস্থ্য কৌশল নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। গত বছর বিদেশি সাহায্য বিতরণের প্রধান মার্কিন সংস্থা ইউএসএআইডি বন্ধের নির্দেশ দেওয়ার পর, প্রশাসন আবারও আফ্রিকান দেশগুলোর স্বাস্থ্য পরিকাঠামো ও রোগ প্রতিরোধে কয়েকশ মিলিয়ন ডলার প্রদানের প্রস্তাব দিচ্ছে। তবে নতুন এই চুক্তিগুলোর সঙ্গে বেশ কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়ায় বেশ কয়েকটি সরকার তা নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
গত ডিসেম্বরে ওয়াশিংটনে কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটোর সঙ্গে প্রথম চুক্তি স্বাক্ষর করেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তখন তিনি আশা প্রকাশ করেছিলেন যে এটি হবে আরও বহু চুক্তির সূচনা। রুবিও বলেছিলেন, ‘আমরা ৩০, ৪০ বা ৫০টি চুক্তি স্বাক্ষরের আশা রাখছি। এটাই প্রথম, আমরা সবসময় এটিকে মনে রাখব এবং আমরা মনে করি নিখুঁত অংশীদার বেছে নিয়েছি।’ কেনিয়ার সঙ্গে এই ২.৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি চূড়ান্ত হতে বিলম্ব হয়, কারণ প্রথমে আদালতে এর বিরুদ্ধে মামলা করেন কর্মীরা। তবে গত মাসে মন্ত্রিসভা চুক্তিটি অনুমোদন করে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নতুন বৈশ্বিক স্বাস্থ্য কৌশলে গ্রহীতা দেশগুলোর ওপর নিজস্ব স্বাস্থ্য ব্যয় বাড়ানোর শর্ত আরোপ করা হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো টেকসই ব্যবস্থা গড়ে তোলা যা শেষ পর্যন্ত স্বনির্ভর হবে। উদাহরণস্বরূপ, কেনিয়ার চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ১.৬ বিলিয়ন ডলার দিচ্ছে, বিনিময়ে পূর্ব আফ্রিকার দেশটি পাঁচ বছরে ৮৫০ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রশাসনের আশা, জাতীয় নেতৃত্বের সাথে সরাসরি অংশীদারিত্ব ঐতিহ্যবাহী দাতা-এনজিও সম্পর্কের চেয়ে বেশি কার্যকর হবে, যা নির্ভরশীলতা ও সমান্তরাল পরিষেবা ব্যবস্থা তৈরি করেছিল।
বিতর্কিতভাবে, এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে মার্কিন ফার্মাসিউটিক্যাল ও মেডিকেল কোম্পানিগুলোকে ওষুধ ও চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নয়ন ও সরবরাহে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। নীতি দলিলে বলা হয়েছে, ‘আমাদের বৈশ্বিক স্বাস্থ্য বিদেশি সাহায্য কেবল দান নয়, এটি সারা বিশ্বে আমাদের দ্বিপাক্ষিক স্বার্থে কৌশলগত মূলধন।’ মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত লাতিন আমেরিকা, ক্যারিবিয়ান ও আফ্রিকার ২০টির বেশি দেশসহ ৩২টি দেশ স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করলেও ঘানা, জিম্বাবুয়ে ও জাম্বিয়া বিভিন্ন কারণে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
জাম্বিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুলাম্বো হাইম্বে স্বাস্থ্য তহবিলের সঙ্গে খনিজ সম্পদে মার্কিন অগ্রাধিকার রক্ষার চুক্তি যুক্ত করার সমালোচনা করেন। বার্তা সংস্থা বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘মার্কিন সহকর্মীরা মনে করেছিলেন দুটি চুক্তি একসঙ্গে আলোচনা ও চূড়ান্ত করা উচিত।’ জাম্বিয়া সরকার চুক্তি দুটি পৃথকভাবে বিবেচনা করতে চেয়েছিল। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর সরাসরি দুটি চুক্তি যুক্ত করার কথা অস্বীকার করলেও ‘আমেরিকা প্রথম’ নীতির কথা জানিয়ে বলে, মার্কিন বিদেশি সাহায্য দান নয় বরং কৌশলগত পুঁজি এবং গ্রহীতা দেশগুলোকে মার্কিন কৌশলগত ও বাণিজ্যিক অগ্রাধিকার গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে সম্প্রতি ইবোলা প্রাদুর্ভাবের প্রেক্ষাপটে USAID কাটছাঁটের প্রভাব স্পষ্ট হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা কেয়ারের কান্ট্রি ডিরেক্টর আমাদু বোকোম জানান, ইউএসএআইডি তহবিল বন্ধে তাকে ৩৬ জন কর্মী ছাঁটাই করতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘যথাযথ তহবিল থাকলে আমরা প্রথম দিন থেকেই পিপিইর মতো প্রয়োজনীয় সরবরাহ বিতরণ শুরু করতে পারতাম। কিন্তু কিছুই না থাকায় আমরা ১০ দিন হারিয়েছি।’ বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউএসএআইডি ভেঙে দেওয়া ইবোলা শনাক্তকরণ ও প্রতিক্রিয়ার গতিতে বড় আঘাত হেনেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, নতুন ব্যবস্থায় তাদের সহায়তা ‘অধিক সমন্বিত ও কার্যকর’ এবং তারা ইবোলা মোকাবিলায় ২৭০ মিলিয়ন ডলার দিয়েছে।
কিছু আফ্রিকান দেশ সমঝোতা স্মারকে মার্কিন পক্ষের স্বাস্থ্য তথ্য ও প্যাথোজেন ভাগাভাগির শর্ত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ঘানার তথ্য সুরক্ষা কমিশনের নির্বাহী পরিচালক আরনল্ড কাভারপুও জানান, ‘তথ্যের পরিধি ও ব্যাপ্তি নিয়ে আমাদের উদ্বেগ ছিল। ঘানার তথ্য ও সার্বভৌমত্বের সুরক্ষায় কোনো পারস্পরিক ব্যবস্থা ছিল না।’ জিম্বাবুয়ে মেডিকেল তথ্য মার্কিন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ভাগাভাগির শর্ত প্রত্যাখ্যান করেছে, কারণ উন্নত ওষুধ বা ভ্যাকসিন নাগরিকদের ফিরে পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না।
ট্রাম্প প্রশাসনের এই কৌশলকে স্বাগত জানিয়েছে তানজানিয়া, কিন্তু আরও কয়েকটি দেশ ‘না ধন্যবাদ’ জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নীতি কতদূর পুনর্বিন্যস্ত হবে তা এখনই বলা কঠিন। সাবেক মার্কিন সিডিসি পরিচালক ডা. কেভিন ডিকক সতর্ক করে বলেন, ‘দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সম্মিলিত চ্যালেঞ্জগুলোর প্রতি উদাসীন থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংজ্ঞায়িতভাবেই সীমান্ত অতিক্রম করে, এক দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সমস্যার জন্য বৈশ্বিক সমাধান প্রয়োজন, কোনো দেশ একা এগোতে পারে না।’




