নাইজেরিয়ার নাগরিক রিচার্ড ইতোরো তার যমজ সন্তানদের কবে আবার দেখতে পাবেন, তা নিয়ে সংশয়ে ভুগছেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসী-বিরোধী বিক্ষোভ তীব্র হয়ে ওঠায় নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত ৪৭ বছর বয়সী এই ব্যক্তি গত জুন মাসে স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার ফ্লাইটে চড়ে জোহানেসবার্গে তার পরিবার ও গাড়ি-বিক্রয়ের কারবার ফেলে আসেন।

ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনকে (বিবিসি) ইতোরো আবেগতাপিত কণ্ঠে জানান, তার চোখে পানি চলে আসে যখন তিনি তার দক্ষিণ আফ্রিকার স্ত্রীকে বিদায় জানানোর স্মৃতিচারণ করেন। স্ত্রীকে তিনি নিজের সবচেয়ে ভালো বন্ধু বলে অভিহিত করেন। বিগত ১৫ বছরে গড়ে তোলা সবকিছু — একটি বাড়ি, একটি সংসার ও একটি গাড়ির ব্যবসা — সবই এখন তার জন্য অতীত।

তিনি যখন হয়রানির লক্ষ্যবস্তু হন, তখন তার স্ত্রীও প্ররিশোধকারীদের রোষানল থেকে রক্ষা পাননি। প্রতিবেশীরা তার স্ত্রীকে বলে, একজন নাইজেরিয়ানকে বিবাহ করার জন্য তাদের গ্রেফতার করা উচিত এবং তাদের দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত। ইতোরো বলেন, “আমার পরিবার ছিল একটি ছোট, শান্তিপূর্ণ ও সুন্দর পরিবার। কারো সাথে আমার কোনো সমস্যা ছিল না।” তার কথায়, নিজ দেশে ফিরে গিয়ে নতুন করে শুরু করাও এখানে থেকে প্রতিনিয়ত হয়রানি ও জীবনের ভয়ে থাকার চেয়ে ভালো।

তবে ইতোরো জানান, নাইজেরিয়ার হাইকমিশন তার স্ত্রী ও সন্তানদের তার সাথে যাত্রার অনুমতি দেয়নি। শেষ মুহূর্তে ঘেরাওকৃত শহর থেকে শেষ হেলিকপ্টার ফ্লাইটে ওঠার দৃশ্যের সাথে তিনি এর তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, “আমি যদি দূতাবাসের লোকদের অন্তত অনুরোধ করে বলতে পারতাম যে এটি আমার স্ত্রী, আমি ওকে ও আমার বাচ্চা ছেড়ে যেতে পারি না। কিন্তু আমি পারিনি।”

দক্ষিণ আফ্রিকার অভিবাসী-বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর দাবি, তাদের বিক্ষোভ কেবল বৈধ কাগজছাড়া বিদেশিদের বিরুদ্ধে। জোট সরকারের অন্যতম শরিক দলের নেতা ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী গেটন ম্যাকেঞ্জিও বিবিসিকে বলেন, “দক্ষিণ আফ্রিকা আমাদের ভাইদের জন্য খোলা, কিন্তু বৈধভাবে আসুন।” কিন্তু ইতোরো বিবিসিকে তার বৈধ থাকার নথির একটি কপি দেখিয়ে দাবি করেন, তার বৈধ মর্যাদা তাকে সহিংসতা থেকে রক্ষা করতে পারেনি।

নাইজেরিয়ার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোলা এনিকানোলাইয়ে সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোনাল্ড লামোলার সাথে এক বৈঠকে জানান, বৈধ কাগজ থাকা সত্ত্বেও অনেক নাইজেরীয় নাগরিক আক্রান্ত হওয়ার রেকর্ড তাদের কাছে রয়েছে। সম্প্রতি মাদক সন্দেহে গ্রেপ্তারের সময় পুলিশি হেফাজতে এক নাইজেরিয়ানের মৃত্যুতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। লামোলা এ প্রসঙ্গে বলেন, দেশ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়, কিন্তু প্রেসিডেন্ট রামাফোসাও অভিবাসন আইন প্রয়োগের সার্বভৌম অধিকারে দৃঢ়।

সামাজিক গণমাধ্যমে ঘুরতে থাকা ভিডিওগুলো দক্ষিণ আফ্রিকার ভাবমূর্তির ব্যাপক ক্ষতি করেছে। ঘানার নাগরিক ইমানুয়েল আসামোয়াহ ২০২৩ সালে সুযোগের খোঁজে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাড়ি জমান। জোহানেসবার্গের শহরতলী সোয়েটোতে বসবাস করা ৩৭ বছর বয়সী এই হেয়ারস্টাইলিস্টের জীবন এপ্রিলে এক ঘটনায় ওলট-পালট হয়ে যায়। একদল দক্ষিণ আফ্রিকান তাকে ঘিরে ধরে চলে যাওয়ার দাবি করে। এক নারী তাকে বলে, “তোমরা এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরে বেড়ানোর বিষয়টি আর চলবে না। এখন আমরা পরিষ্কার করে বলছি, আমরা তোমাদের এখানে চাই না।”

আসামোয়াহ এখন ঘানায় ফিরে এসে নতুন এক সিমেন্টের ব্যবসা খুলেছেন এবং নিজের দেশ গোড়ার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। কিন্তু ঘানার পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যামুয়েল ওকুডজেটো আবলাকওয়া বিবিসিকে বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকার এই আচরণ মহাদেশীয় সংহতির চেতনাবিরোধী এবং বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে আফ্রিকার দেশগুলোর সাহায্যের স্বীকৃতি দিতে ব্যর্থ। অন্যদিকে, লাগোসে ফিরে আসা ইতোরো এখনো পরিবারের জন্য উদগ্রীব হয়ে আছেন। তিনি বলেন, প্রতিদিন কথা হয় এবং আমি ভাঙা মনে হলেও আশা আছে, কারণ শিগগিরই আমার স্ত্রী আমার কাছে চলে আসবে।