পারিবারিক আর্থিক টানাপোড়েন ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে কক্সবাজারের এক তরুণী যুক্তরাষ্ট্রে ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জনের লক্ষ্যে পাড়ি জমাচ্ছেন। নীলা ওয়ান রাখাইন নামের এই শিক্ষার্থী একইসঙ্গে তিনটি মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডির সুযোগ লাভ করলেও, পাঁচ বছরের পূর্ণাঙ্গ বৃত্তির নিশ্চয়তায় চূড়ান্তভাবে বেছে নিয়েছেন সাউথ ক্যারোলাইনার ক্লেমসন ইউনিভার্সিটিকে। আগামী ১ আগস্ট তার আমেরিকার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে। টিচিং অ্যান্ড লার্নিং বিষয়ে গবেষণা শেষে অর্জিত জ্ঞান বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে, বিশেষ করে প্রান্তিক ও আদিবাসী শিক্ষার্থীদের মাঝে কাজে লাগাতে আগ্রহী তিনি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের এই শিক্ষার্থীর শিকড় নিবিড়ভাবে জড়িত কক্সবাজারে। তাঁর পিতা মংফ্রুথেন রাখাইন, পেশায় যিনি একজন দরজি, চার জনের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। অর্থের অভাবে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং-এর খরচও জোগাড় হয়নি। নিজের পরিশ্রমেই জয় করে নিতে হয়েছে প্রতিটি ধাপ। এসএসসি ও এইচএসসি শেষ করার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিকালে তিনি একটি প্যাথলজি ক্লিনিকে চাকরি করতেন, যেখানে মাসে তার উপার্জন ছিল প্রায় চার হাজার টাকা। সেই অর্জিত অর্থের একাংশ তিনি সংসারে দিতেন, আর বাকিটা জমিয়ে রাখতেন ভবিষ্যতের উচ্চশিক্ষার খরচ হিসেবে।

সমাজের একাংশের কটূ কথাও থেমে থাকেনি। নীলা ওয়ান রাখাইনের ভাষায়, ‘এক স্বজন মাকে বলেছিল, মেয়েটাকে এত লেখাপড়া করিয়ে লাভ কী, শেষমেশ তো সংসার করবে। কথাটা মর্মাহত করলেও, কাজ দিয়ে জবাব দেওয়ার দৃঢ় বিশ্বাসই আমাকে সবসময় এগিয়ে দিয়েছে।’ বৌদ্ধ ধর্মের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের প্রতি গভীর টানের জেরেই তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি বিভাগকে বাছাই করেছিলেন। সেখান থেকে ৩.৪৫ সিজিপিএ নিয়ে স্নাতক শেষ করেন। পরবর্তীকালে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন থেকে শিক্ষা বিষয়ে ৩.৫২ সিজিপিএ অর্জন করেন স্নাতকোত্তরে।

শিক্ষাবিস্তারে তাঁর আগ্রহ শুধু নিজের পড়াশোনাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বিনামূল্যে শিক্ষাদান, শিক্ষামূলক ভিডিও নির্মাণ এবং এমনকি মিয়ানমারের শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন ক্লাস নেওয়ার অভিজ্ঞতাই ধীরে ধীরে তাঁকে গবেষণার দিকেই মোড় নিতে সহায়তা করে। স্নাতকোত্তরের শেষ সেমেস্টারে থাকতে তিনি ইউনিসেফের এক প্রকল্পে প্রশিক্ষকের ভূমিকায় যোগ দেন। পরে দশ মিনিট স্কুলেও ইংরেজি প্রশিক্ষক ও কনটেন্ট নির্মাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর সম্প্রদায়ের শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা নিশ্চিতে নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন ‘চালুং একাডেমি’ নামক একটি প্ল্যাটফর্ম।

পিএচডির জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা সংগঠন, যেমন রঁদেভু শিল্পী গোষ্ঠী ও বাংলাদেশ রাখাইন স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাথে সম্পৃক্ত থেকে নেতৃত্ব ও দলগত কাজের দক্ষতা অর্জন করেছেন। স্নাতকোত্তর অধ্যয়নকালেই নি জ রাখাইনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। যৌথ পরিবারের জটিলতা মাথায় রেখেও স্বামী ও বাবার নিরন্তর সমর্থনই তাঁকে লক্ষ্যচ্যুত হতে দর্শায়নি। আবেদন প্রক্রিয়ার প্রতিটি পর্যায়ে স্বামীই ছিলেন তাঁর প্রধান অনুপ্রেরণাদাতা।

তিনি যে শুধু ক্লেমসনেই সুযোগ পেয়েছেন তা নয়, ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি ও কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকেও পিএইচডি করার ডাক পেয়েছিলেন নীলা ওয়ান। কিন্তু ক্লেমসনেই পাঁচ বছরের জন্য সম্পূর্ণ অর্থায়নের নিশ্চয়তা পাওয়ায় সেটিকেই তিনি অগ্রাধিকার দেন। মেয়েদের ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের শিক্ষার চ্যালেঞ্জগুলো স্বচক্ষে দেখেছেন বলেই ভবিষ্যতে একটি সমতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ার স্বপ্ন দেখছেন। তাঁর পরিষ্কার প্রত্যয়, “আমি দেশ ছেড়ে যাচ্ছি, তবে স্বপ্ন নিয়ে যাচ্ছি দেশের জন্যই কিছু করছ।”