যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ বর্তমানে যে ঋণ ব্যবস্থাপনা কৌশল গ্রহণ করেছে, তা ফেডারেল রিজার্ভের সাম্প্রতিক কঠোর অবস্থানের কারণে চাপের মুখে পড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ সম্প্রতি মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। একই সুরে ডালাস ফেডের প্রেসিডেন্ট লরি লোগান বলেছেন, মুদ্রাস্ফীতি অত্যধিক দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ রয়েছে এবং তা ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রায় ফিরে আসার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ক্লিভল্যান্ড ফেডের প্রেসিডেন্ট বেথ হ্যাম্যাক উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ব্যবসায়ীরা এখন পদক্ষেপ চাইছেন এবং ভোক্তারা হিমশিম খাচ্ছেন। সর্বশেষ ভোক্তা মূল্যসূচক প্রত্যাশার চেয়ে কম আসায় স্বস্তি মিললেও অর্ধেক নীতি নির্ধারক শিগগিরই সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এতে ব্যাংক অব আমেরিকা তাদের পূর্বাভাস সংশোধন করে জানিয়েছে, এখন তারা চলতি বছর তিনটি কোয়ার্টার-পয়েন্ট সুদবৃদ্ধির আশা করছে; আগে তারা ধরে নিয়েছিল সারা বছর হার অপরিবর্তিত থাকবে।

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবার বেড়েছে। ফলস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রের পেট্রোলের গড় দাম প্রতি গ্যালনে ৪ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বুমের কারণে ইউটিলিটি বিল, ইলেকট্রনিক্স ও নির্মাণসহ নানা খাতে খরচ বেড়েছে, যা সামগ্রিক মূল্যচাপকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এই অবস্থায় ট্রেজারি বিভাগ বিপুল পরিমাণ ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে। বার্ষিক বাজেট ঘাটতি প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে বন্ড বাজারে প্রতিযোগিতাও বেড়েছে, কেননা বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান (হাইপারস্কেলার) এআই বিনিয়োগের জন্য শত শত বিলিয়ন ডলার ঋণ নিচ্ছে। এমনকি ঐতিহাসিকভাবে কঠোর বাজেটনীতির জন্য পরিচিত জার্মান সরকারও সামরিক ব্যয় বাড়াতে ২০৩০ সালের মধ্যে ৮০০ বিলিয়ন ইউরো ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। ফলে ট্রেজারি বন্ডের চাহিদা কিছুটা কমেছে। ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ট্রেজারি বন্ডের পক্ষে থাকা হইসিংটন ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট সম্প্রতি তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও ফলনের পূর্বাভাস দিয়েছে। তাদের মতে, ক্রমবর্ধমান ঋণের ফলে বিনিয়োগকারীরা ট্রেজারি সিকিউরিটির ওপর ক্রমাগত উচ্চ ঝুঁকি প্রিমিয়াম দাবি করছেন।

এখন পর্যন্ত ক্যাপিটাল ইকোনমিক্স মনে করছে, ট্রেজারি বন্ডের ফলনের সম্প্রতি বৃদ্ধি সরকারের ঋণ পরিশোধ সক্ষমতার ওপর আস্থা নষ্ট করেনি। তবে প্রতিষ্ঠানটির জ্যেষ্ঠ উত্তর আমেরিকা অর্থনীতিবিদ আরিয়ান কার্টিস সতর্ক করে বলেছেন, 'ফলন যত বেশি থাকবে এবং সেই স্তরে যত বেশি ঋণ পুনঃঅর্থায়ন বা ইস্যু করা হবে, ঋণের পথ তত বেশি অটেকসই হয়ে উঠবে। বিশেষ করে উন্নত অর্থনীতিতে বন্ড বাজার যখন উচ্চ ঋণ ও রাজস্ব বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠছে, তখন রাজস্ব ঝুঁকি গুরুতর রয়ে গেছে।'

ট্রেজারি বিভাগ মোট ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণের সুদ ব্যয় নিয়ন্ত্রণে স্বল্পমেয়াদি সিকিউরিটির ওপর বেশি নির্ভর করছে। ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের তথ্যানুযায়ী, গত কয়েক বছরে মোট ঋণ ইস্যুর ৮৫ শতাংশই ছিল ট্রেজারি বিল, যার মেয়াদ এক বছর বা তার কম। ফলে আগামী চার মাসে মোট জারিকৃত ঋণের ২০ শতাংশ এবং এক বছরের মধ্যে ৩৩ শতাংশ পরিপক্ক হবে। কার্টিসের মতে, ফেড যদি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সুদের হার বাড়ায় এবং স্বল্পমেয়াদি ফলন তীব্রভাবে বেড়ে যায়, তাহলে ঋণের বোঝা সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে।