মিয়ানমারের শহীদ কবি খেৎ থির (আসল নাম জও তুন) জীবন ও মৃত্যুর কাহিনি এখনো দেশটির সামরিক জান্তাবিরোধী আন্দোলনের এক জ্বলন্ত প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। ১৯৭৬ সালে জন্ম নেওয়া এই কবি ২০২১ সালের ৮ মে সন্ধ্যায় সাগাইং অঞ্চলের শোয়েবো শহরের নিজ বাড়ি থেকে স্ত্রী সও সু-সহ সামরিক বাহিনীর হাতে আটক হন। প্রথমে স্থানীয় থানায় আটকে রাখার পর তাঁকে স্ত্রীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিকটস্থ একটি সামরিক ছাউনিতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই সেই রাতেই নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে তাঁর মৃত্যু ঘটে। পরদিন ৯ মে সকালে স্ত্রীকে থানা থেকে মুক্তি দিয়ে জানানো হয় যে জিজ্ঞাসাবাদে আহত হয়ে তাঁর স্বামী মনিওয়া হাসপাতালে ভর্তি আছেন। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছে তিনি জানতে পারেন, মৃতদেহ হিসেবেই তাঁর স্বামীকে সেখানে আনা হয়েছিল। মর্গে গিয়ে তিনি দেখেন, স্বামীর ক্ষতবিক্ষত দেহ পড়ে আছে এবং সেখান থেকে অভ্যন্তরীণ নানা অঙ্গ কেটে খুলে নেওয়া হয়েছে। বিস্ফোরক সামগ্রী মজুতের সন্দেহে তাঁকে আটক করা হলেও শেষ পর্যন্ত জান্তা কোনো প্রমাণ খুঁজে পায়নি। বহু নির্যাতনের পরও তাঁর মুখ থেকে কোনো স্বীকারোক্তি আদায় করা যায়নি; মৃত্যুঞ্জয়ী এই কবি আমৃত্যু নীরব থেকে গেছেন।
খেৎ থি পেশায় ছিলেন একজন প্রকৌশলী। ২০০৪ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত তিনি কালায়, শোয়েবো ও মনিওয়া পৌরসভায় জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে চাকরি ছেড়ে দেন সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন ও লেখালেখিতে পুরোপুরি মনোনিবেশ করার জন্য। জীবিকার তাগিদে তিনি ও তাঁর পরিবার খণ্ডকালীনভাবে নিজেদের তৈরি কেক ও আইসক্রিম বিক্রি করতেন। শহীদ হওয়ার মাত্র দুই বছর আগে তিনি বিয়ে করেছিলেন। ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারির সামরিক অভ্যুত্থানের পর সাগাইংয়ের পালে অঞ্চলে সামরিক একনায়কতন্ত্রবিরোধী সংগ্রামের সম্মুখসারীর একজন অংশীদার হিসেবে সক্রিয় ছিলেন তিনি। তাঁর শাহাদাতবরণের সময় তাঁর নিজ ভাই সামরিক জান্তাবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে মনিওয়া কারাগারে বন্দী ছিলেন। বৃদ্ধ মায়ের কাছে তাঁর মৃত্যুসংবাদ গোপন রাখা হয়।
মিয়ানমারে ২০২১-এর মার্চে সামরিক অভ্যুত্থানের পর মাত্র দুই মাসের মধ্যে সাগাইং অঞ্চলে মোট তিনজন কবিকে জান্তা বাহিনী হত্যা করে। ৪৫ বছর বয়সী খেৎ থি ছাড়াও শহীদ হন ৩৯ বছর বয়সী কবি কে জা উইন ও ৩৬ বছর বয়সী কিই লিন্ আয়ে। জাতীয় ঐক্য সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও কবি উ য়ী মন্ তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজে লিখেছেন, “খেৎ থিসহ মনিওয়ার তিনজন কবি শহীদ হয়েছেন। আমি শোকার্ত। জয় না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে আমি অঙ্গীকারবদ্ধ।” কবি ইয়ো খাৎ এই মৃত্যুকে কবিতার জগতে এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মতে, আদিকাল থেকে কবিরা হৃদয় ও মস্তিষ্ক দিয়ে অন্যায়ের প্রতিরোধ করে আসছেন; খেৎ থিও বিপ্লবের শুরু থেকেই ঠিক সেটাই করে যাচ্ছিলেন। জ্ঞান বিতরণের মাধ্যমে তিনি মানুষকে বিপ্লবে অনুপ্রাণিত করেছেন। তাঁর কবিতা ছিল সরল ও স্বচ্ছ—কোনো সূক্ষ্ম অলংকার বা রূপকের আশ্রয় নেওয়া হতো না। একটি অনামধেয় কবি ও আন্দোলনকর্মী বলেছেন, খেৎ থির কবিতা নিছক সাহিত্য ছিল না, ছিল তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারার সরাসরি প্রকাশ; তাঁর ভাষা ছিল ধনুক থেকে নিক্ষিপ্ত তিরের মতো, যা পাঠকের হৃদয়ে সরাসরি গেঁথে যায়।
জান্তা খেৎ থির দেহের ওপর নির্যাতন চালালেও তাঁর চেতনাকে স্পর্শ করতে পারেনি। তাঁর ভাবধারাকে তারা হত্যা করতে ব্যর্থ হয়েছে। কবির নিজের লেখা—“ওরা মাথায় গুলি করে, কিন্তু ওরা জানে না বিপ্লব থাকে হৃদয়ে”—এই পঙ্ক্তিগুলো এখন মিয়ানমার ছাড়িয়ে দেশ-দেশান্তরের সব বিপ্লবী হৃদয়ে চিরজাগরূক। তিনি আরও লিখেছিলেন, “আমি যদি আর এক মিনিটও বাঁচি আমি চাই, আমার বিবেক যেন পরিষ্কার থাকে।” আমৃত্যু তিনি সেই বিবেক পরিষ্কার রেখেই গেছেন; কোনো মূল্যের বিনিময়েই জনবিরুদ্ধতার কালিমা তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। ২০২১-এর সামরিক অভ্যুত্থানের পর প্রথম দুই মাসে উল্লিখিত তিন কবিসহ কমপক্ষে ৭৬১ জন নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করা হয়। খেৎ থির শব্দাবলি এখন সারা মিয়ানমারে এবং দেশের বাইরেও ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—এটি তাঁর অমরত্বের প্রমাণ।
তাঁর দুটি অনূদিত কবিতাও এই সত্যের সাক্ষ্য বহন করে। প্রথমটি “টিকে থাকার স্মারকলিপি” নামে পরিচিত, যেখানে তিনি ঘোষণা করেন তিনি কোনো বীর, শহীদ বা কাপুরুষ হতে চান না; সুবিধাবাদী রাজনীতিক বা স্বপ্নচারী কবিও হতে চান না। তিনি চান নিজেরাই নিজেদের নরকের অবসান ঘটান এবং যেকোনো মুহূর্তে বিবেক পরিষ্কার রাখেন। দ্বিতীয় কবিতায় তিনি বলেন, তাঁর হাত গিটার বাজায় ও কবিতা লেখে, বন্দুক চালাতে পারে না; কিন্তু এখন যখন তাঁর মানুষদের গুলি করা হচ্ছে, শুধু কবিতা দিয়ে পাল্টা গুলি চালানো সম্ভব নয়। তবু অপরাধবোধে ভরা মনে তিনি সিদ্ধান্ত নেন—যখন নিশ্চিত হবেন শুধু শব্দ দিয়ে আর কিছু বলা যাবে না, তখন সাবধানে বন্দুক বেছে নিয়ে তিনি গুলি ছুড়বেন। এই কবিতাগুলোই প্রমাণ করে, খেৎ থির জীবন ও কর্মের মধ্যে কোনো ফারাক ছিল না; তিনি যা ভাবতেন, সরাসরি সেটাই প্রকাশ করতেন।




