ইউরোপ জুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ ও খরার কারণে সৃষ্ট দাবানলে গ্রিস ও ফ্রান্সে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। সোমবার এথেন্সের পশ্চিমে এক বিধ্বংসী দাবানল নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আগুন নেভানোর কাজে নিয়োজিত দুটি হেলিকপ্টারের মধ্যে আকাশে সংঘর্ষে দুই আরোহী প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতরা হলেন এক গ্রিক ও এক ডেনিশ নাগরিক, যারা বেসরকারি অপারেটর হিসেবে গ্রিক ফায়ার সার্ভিসের হয়ে কাজ করছিলেন। সংঘর্ষে আহত আরও দুজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আগুনের লেলিহান শিখা দ্রুত গ্রাম ও বাড়িঘরে ছড়িয়ে পড়ায় শতাধিক মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পোর্তো জারমেনো সমুদ্র সৈকত ও আশপাশের এলাকা থেকে এক হাজারের বেশি বাসিন্দাকে সরানো হয়েছে, যার মধ্যে ২৫০ জনকে নৌকা করে উদ্ধার করা হয়েছে। দমকল বাহিনীর মুখপাত্র ইয়ানিস আর্তোপিওস জানান, এটি একটি অত্যন্ত কঠিন আগুন যা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তিনি আরও জানান, এই আগুন নিয়ন্ত্রণে ১২টি জল নিক্ষেপকারী বিমান এবং ১১টি হেলিকপ্টার কাজ করছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, একটি বায়ু খামারের ত্রুটিপূর্ণ বিদ্যুৎ লাইন থেকে এই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। এর জেরে দুই ঠিকাদারকে অসাবধানতাবশত অগ্নিসংযোগের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রিসের রাজধানী এথেন্সের আশপাশের এলাকায় আগামী কয়েকদিন ঝুঁকি বিরাজ করবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বোর্দো অঞ্চলের আগুন এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সেখানে প্রায় চারশো বিশ বর্গকিলোমিটার এলাকা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, যা ফ্রান্সের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দাবানল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই অঞ্চল থেকে দুই লাখেরও বেশি মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, যা যুদ্ধকালীন সময়ের বাইরে দেশের সবচেয়ে বড় বেসামরিক উচ্ছেদ হিসেবে বিবেচিত। সোমবার থেকে উচ্ছেদকৃতরা তাদের বাড়ি ও ছুটির বাসস্থানে ফিরতে শুরু করেছেন। ক্যাপ ফেরেট উপদ্বীপ এবং লে পোর্জ পৌরসভায় ফিরতে দেওয়া হয়েছে। তবে ক্যাম্পসাইটগুলো বন্ধই থাকছে। অন্যদিকে, প্রোভঁস অঞ্চলের আরেকটি বড় দাবানল এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি এবং বাতাসের গতি বাড়ার আশঙ্কায় ফায়ার সার্ভিস সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। ব্রিটেনের আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে গত জুলাই মাস প্রায় দুইশো বছরের মধ্যে সবচেয়ে শুষ্ক ছিল। তীব্র তাপপ্রবাহ ও বৃষ্টির অভাবে সারা দেশে খরা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ওয়েলসের পুরো এলাকা এবং ইংল্যান্ডের অর্ধেকের বেশি অঞ্চল আনুষ্ঠানিকভাবে খরা ঘোষণা করা হয়েছে। মে ও জুন মাসে তাপপ্রবাহের পর জুলাইতেও তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপার্নিকাস জলবায়ু পরিষেবার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০-এর দশক থেকে ইউরোপের উষ্ণায়নের হার বিশ্বের গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি। তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘস্থায়ী খরা গাছপালাকে আরও শুষ্ক ও দাহ্য করে তুলছে, যার ফলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং আরও তীব্র আকার ধারণ করছে। ইউরোপীয় বন দাবানল তথ্য ব্যবস্থা সতর্ক করেছে যে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ইউরোপের বিভিন্ন অংশে দাবানলের ঝুঁকি বেশি থাকবে, যার মধ্যে ঐতিহ্যগতভাবে শীতল উত্তরাঞ্চলীয় দেশগুলিও অন্তর্ভুক্ত। নেদারল্যান্ডসের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ লিম্বুর্গের একটি বনে সোমবার বড় ধরনের আগুন লেগেছে। দেশটির বিমানবাহিনী পানি বহনে সক্ষম দুটি চিনুক হেলিকপ্টার পাঠিয়েছে। আগুনের কারণে এলাকার দুটি শহরের মধ্যে ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ধোঁয়ার কারণে এলাকার একটি ক্যাম্পসাইট খালি করা হয়েছে।