ঘুমের সময় শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার রোগ (স্লিপ অ্যাপনিয়া)-র চিকিৎসায় একটি যুগান্তকারী ওষুধ আনতে যাওয়া কোম্পানি অ্যাপনিমেড, বাজার অনুমোদনের আগেই বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ যাচাই করে দেখল। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের ক্যামব্রিজে অবস্থিত এই বায়োটেক কোম্পানিটি বর্ধিত পরিসরের প্রাথমিক গণপ্রস্তাবে (আইপিও) প্রতিটি শেয়ার ১৬ ডলার দরে বিক্রি করে ১৯২ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে। এই মূল্যায়নে প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক বাজারমূল্য ৬০০ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। কোম্পানির শেয়ার শুক্রবার থেকে নাসডাক স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন শুরু হবে।
৫০ বছর বয়সী প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কেভিন লিন্ড ফোর্বসকে বলেন, 'এটি একটি এক-মাপের-সবার-জন্য রোগ, যার চিকিৎসাও একটি এক-মাপের-সবার-জন্য যন্ত্র দিয়ে হয়ে আসছে। এর চেয়ে ভালো পথ রয়েছে।' লিন্ড গত জুন মাসে সহ-প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি মিলারের স্থলাভিষিক্ত হন। ৭৩ বছর বয়সী মিলার একজন ফুসফুসরোগ বিশেষজ্ঞ ও ধারাবাহিক উদ্যোক্তা, যিনি কোম্পানিটি শুরু করার জন্য নিজের অবসর স্থগিত করেছিলেন। কোম্পানিটির প্রাক্তন বোর্ড চেয়ারম্যান লিন্ড এর আগে লংবোর্ড ফার্মাসিউটিক্যালস-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, যে প্রতিষ্ঠানটি একটি মৃগীরোগের ওষুধ তৈরি করে এবং ২০২৪ সালে ডেনমার্কের লুন্ডবেক ২.৬ বিলিয়ন ডলারে সেটি কিনে নেয়। মিলার এখন ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে বোর্ডে রয়েছেন।
চলতি বছরের শুরুর দিকে ফোর্বস অ্যাপনিমেডের উপর একটি বিশদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। স্লিপ অ্যাপনিয়া এমন একটি সাধারণ সমস্যা, যেখানে ঘুমের মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায় এবং কখনও কখনও অক্সিজেনের মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে নেমে যেতে পারে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই প্রায় ৮০ মিলিয়ন মানুষ এই রোগে আক্রান্ত। ওষুধ তৈরির জন্য বহু দশক ধরে গবেষকদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমানে এর প্রধান চিকিৎসা হলো কন্টিনিউয়াস পজিটিভ এয়ারওয়ে প্রেসার (সিপিএপি) নামক একটি যন্ত্র, যা ব্যবহারকারীর গলায় জোর করে বাতাস ঢুকিয়ে শ্বাসনালী খোলা রাখে। ডিভাইসটি কাজ করলেও অধিকাংশ ব্যবহারকারীর কাছেই এটি অত্যন্ত অপছন্দের। অনেক স্লিপ অ্যাপনিয়া রোগী এটি ব্যবহার করার চেষ্টাও করেন না অথবা এটি পরতে হতে পারে এই ভয়ে রোগ নির্ণয়ই করাতে চান না।
লিন্ড জানান যে, আক্রান্তদের মধ্যে অল্পসংখ্যক, মাত্র ২৩ মিলিয়ন মানুষ, আনুষ্ঠানিকভাবে রোগ নির্ণীত হয়েছেন, আর তাদের মধ্যে ১০.৫ মিলিয়ন মানুষ কোনো চিকিৎসাই নিচ্ছেন না। লিন্ডের মতে, 'এটি বাজার সম্প্রসারণের এক অসাধারণ সুযোগ। আমাদের জন্য শুরু করার সবচেয়ে সহজ জায়গা হলো সেই ১০.৫ মিলিয়ন মানুষ, যারা রোগী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন কিন্তু চিকিৎসা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।'
গবেষণায় দেখা গেছে, চিকিৎসাবিহীন স্লিপ অ্যাপনিয়া আক্রান্তদের হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং সম্ভবত পার্কিনসন ও আলঝাইমার রোগের সম্ভাবনা বাড়ে। রোগীর জন্য সহনীয় একটি চিকিৎসা তাদের সার্বিক স্বাস্থ্যে রূপান্তরকারী প্রভাব ফেলতে পারে। ২০১৬ সালের নভেম্বরে হার্ডার্ডের গবেষক ডা. লুইজি তারান্টো মনেটেমুরো, যিনি এখন অ্যাপনিমেডের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, একটি সম্ভাব্য অ্যাপনিয়া ওষুধ পরীক্ষা করতে গিয়ে বিস্ময়ের সঙ্গে দেখেন যে সেটি তার পরীক্ষামূলক ব্যক্তির স্বাভাবিক শ্বাসকার্যে সহায়তা করছে। ২০১৭ সালে সেই সম্ভাব্য থেরাপির সত্ত্ব কিনে নিয়ে অ্যাপনিমেডের যাত্রা শুরু।
কোম্পানির প্রাথমিক বিনিয়োগকারীরা এই আইপিওর মাধ্যমে বেশ মুনাফা করতে যাচ্ছেন। মর্নিংসাইড গ্রুপ, আলফা ওয়েভ গ্লোবাল এবং সেক্টরাল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের মতো বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে কোম্পানিটি প্রায় ২৬০ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছিল, যার সময় এর মূল্যায়ন ছিল প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার। ঘুমের চিকিৎসা খাত দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্ব না পেলেও সম্প্রতি পরিবর্তন আসছে। ২০২৪ সালের শেষে এফডিএ ইলি লিলির ওজন কমানোর ওষুধ জেপবাউন্ডকে স্থূলতায় আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের মাঝারি ও তীব্র স্লিপ অ্যাপনিয়ার চিকিৎসায় অনুমোদন দেয়। অ্যাপনিমেডের ওষুধের মতো সরাসরি নয়, বরং যেহেতু অতিরিক্ত ওজনের মানুষদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, তাই জেপবাউন্ড পরোক্ষভাবে কাজ করে। লিন্ড বলেন, 'মানুষ বিশ্বাস করতে চায় যে অবসট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া (ওএসএ) স্থবিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত, কিন্তু আক্রান্তদের ৬০ ভাগের বেশি স্থবিকি নয়।'
প্রসপেক্টাস অনুসারে, গত বছর অ্যাপনিমেড মাত্র ৩৮ মিলিয়ন ডলার রাজস্বের বিপরীতে ৫৮ মিলিয়ন ডলার নিট লোকসান করে। গত মার্চে জাপানি বায়োটেক কোম্পানি শিওনোগির সঙ্গে আরেকটি স্লিপ অ্যাপনিয়া থেরাপি সংক্রান্ত যৌথ উদ্যোগে তাদের ৫০ শতাংশ অংশীদারি ওই প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে দেয়। চুক্তি অনুযায়ী তারা ১০০ মিলিয়ন ডলার অগ্রিম, সাথে ৫০ মিলিয়ন ডলারের মাইলস্টোন পরিশোধ এবং রয়্যালটি পাবে। নিজেদের ওষুধু তৈরির ওপর মনোযোগ দিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এখন বড় প্রশ্ন হলো, অ্যাপনিমেডের প্রথম স্লিপ অ্যাপনিয়া ওষুধের বানিজ্যিক গতিপথ কী হবে। রাত একবার সেবনের এই বড়িটি কোম্পানিটি এফডিএর অনুমোদনের জন্য জমা দিয়েছে এবং ২০২৭ সালের প্রথম প্রান্তিকে অনুমোদন পেতে পারে। লিন্ড জানান, কোম্পানি এখনও ওষুধটির দাম নির্ধারণ করেনি, তবে এর বাণিজ্যিক লঞ্চের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত একটি ছোট শতাংশ মানুষও যদি এই বড়ি সেবন করে, তাহলে ওষুধটি দ্রুতই 'ব্লকবাস্টার' (অত্যধিক বিক্রিত) হয়ে উঠতে পারে। গত শীতে মিলার ফোর্বসকে বলেছিলেন, 'সংখ্যাগুলো বিস্ময়কর।'



