আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রধান কৌঁসুলি করিম খানকে যৌন অসদাচরণের অভিযোগে অপসারণের পক্ষে ভোট দিয়েছে সদস্য দেশগুলোর পরিষদ ‘অ্যাসেম্বলি অব স্টেটস পার্টিজ’। শুক্রবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এই ভোটাভুটিতে তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তবে করিম খানের আইনি দলের প্রধান তায়াব আলী জানিয়েছেন, জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ তদারকি দপ্তর ‘ওআইওএস’-এর তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অসদাচরণ বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একটি জুডিশিয়াল প্যানেলও সর্বসম্মতভাবে এ সিদ্ধান্ত দিয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তায়াব আলী অভিযোগ করেন, একদিকে আদালত যখন তীব্র রাজনৈতিক চাপের মুখে, অন্যদিকে করিম খান নিজেই যখন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন, ঠিক এমন পরিস্থিতিতে ভোটের মাধ্যমে তাঁকে অপসারণ করা হয়েছে। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে নির্বাচিত কর্মকর্তাদের এ ধরনের অপসারণপ্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখা উচিত, যা রাজনৈতিক, আইনগতভাবে অন্যায্য কিংবা কোনো স্বাধীন জুডিশিয়াল বডির সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই আইনজীবী আরও বলেন, করিম খানকে এমন একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপসারণ করা হয়েছে যেখানে তাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থনের ন্যায্য সুযোগই দেওয়া হয়নি। পূর্ণাঙ্গ প্রমাণ পর্যালোচনা করা স্বাধীন বিচারকদের সিদ্ধান্তও উপেক্ষা করা হয়েছে।

করিম খানের বিরুদ্ধে যৌন অসদাচরণের অভিযোগ প্রথম প্রকাশ্যে আসে প্রায় দুই বছর আগে। সম্প্রতি অভিযোগকারী নারী, যাঁর পরিচয় শুধু ‘সারাহ’ নামে প্রকাশিত, সিএনএনকে বলেন, করিম খানের আচরণ ধীরে ধীরে আরও স্পর্শকাতর ও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। তিনি এমন একটি ঘটনার বর্ণনা দেন যেখানে তাঁর দাবি, তিনি ঘুমের ভান করে থাকাকালে করিম খান তাঁর শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিয়েছিলেন। করিম খান অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর আইনজীবীদের দাবি, যে প্রক্রিয়ায় ভোটাভুটি হয়েছে তা প্রক্রিয়াগতভাবে অন্যায্য এবং প্রমাণসমর্থিত নয়।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করেন করিম খান। পরে আইসিসির বিচারকেরা সেই পরোয়ানা আনুষ্ঠানিকভাবে জারি করেন। এর পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তীব্র তোপের মুখে পড়ে আইসিসি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন করিম খানসহ আইসিসির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ও বিচারকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাবেক পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান জোসেপ বোরেল এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে লিখেছেন, করিম খানের বিরুদ্ধে এ মামলা ‘স্পষ্টতই আইসিসির বিরুদ্ধে পরিচালিত বৃহত্তর আক্রমণের অংশ’। করিম খানকে অপসারণের মধ্য দিয়ে নতুন আইসিসি প্রধান কৌঁসুলি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। তবে এ বিষয়ে ভোট আগামী বছরের আগে হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ইতিমধ্যে ৫৬ বছর বয়সী এই ব্রিটিশ ব্যারিস্টার গত জুনে নিজেই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। বর্তমানে তাঁর দপ্তরের দায়িত্ব পালন করবেন উপপ্রধান কৌঁসুলি নজহাত শামিন খান ও মামে মান্দিয়ায়ে নিয়াং।

নেতানিয়াহু ও গ্যালান্টের বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ওপর এই সিদ্ধান্তের তাৎক্ষণিক কোনো প্রভাব পড়বে না। কারণ ওই পরোয়ানা প্রত্যাহার করতে পারেন শুধু আইসিসির বিচারকেরা। তবে এই খবরে আইসিসির তদন্তের সমালোচনায় নতুন করে সরব হয়েছেন ইসরায়েলি কর্মকর্তারা।