গত বছরের ২১ জুলাই উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের মানসিক ট্রমা দূর করতে বিশেষ এক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার গাজীপুরের পুবাইলে অবস্থিত ছুটি রিসোর্টে ‘সবুজের মাঝে অমর তোমরা’ শিরোনামে এই আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজক হিসেবে ছিল রোটারি ক্লাব অব বনানী, ঢাকা ও ছুটি রিসোর্ট।
দুর্ঘটনার শিকার ১২ বছর বয়সী নূরে জান্নাত ইউসা নামের এক শিক্ষার্থী জানায়, সেদিন স্কুল ছুটির পর দোতলা থেকে নিচতলায় নামার সময় হঠাৎ বিকট শব্দ শুনতে পায় সে। এরপর আর কিছুই মনে নেই; জ্ঞান ফিরেছিল হাসপাতালে। বর্তমানে তার হাতের ফোলাভাব পুরোপুরি কমেনি এবং প্রতি মাসে লেজার থেরাপি নিতে হয়। মানসিক আঘাত থেকেও এখনো বের হতে পারেনি সে। পাইলট হওয়ার স্বপ্ন ছিল তার, কিন্তু এখন বিমান উড়ে গেলেই ভয়ে দুই হাত দিয়ে কান চেপে ধরে। দোলনায় উঠলে নিহত বন্ধুদের কথা মনে পড়ে যায়।
এই আয়োজনে ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির মোট ৬৩ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন চার শিক্ষক। শুরুতে শিশুদের জন্য শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যায়াম ও মাইন্ডফুল এক্সারসাইজ করান ইনোভেশন ফর ওয়েলবিং ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা মনিরা রহমান। এরপর দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে ৩৫টি গাছ লাগানো হয়। শিক্ষার্থীরা নিজ হাতে গাছ এঁকে তাতে বন্ধুদের নাম ও নিজেদের কষ্টের কথা লিখে রাখে।
বিকেলে মেয়েরা ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা—দুই দলে ভাগ হয়ে ফুটবল খেলে। রেফারির দায়িত্ব পালন করেন জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার রেহানা পারভীন। তিনি বলেন, ‘এই শিশুদের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রাখতে পারলে ট্রমা অনেকটাই কেটে যাবে।’ খেলার পর নিজেদের ইচ্ছেমতো খেলাধুলা করারও সুযোগ পায় তারা।
ছুটি রিসোর্ট পুবাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সামসুল ইসলাম মাসুদ জানান, দুর্ঘটনার স্মৃতি ও আতঙ্ক কাটিয়ে স্বজনহারা শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে এই আয়োজন করা হয়। ভবিষ্যতে এমন উদ্যোগ আরও নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন রোটারি ক্লাব অব বনানী ঢাকার প্রেসিডেন্ট মো. শরীফউল্লাহ।
এই আয়োজনের ধারণা প্রথম দিয়েছিলেন সাংবাদিক ও রোটারিয়ান শাহনাজ শারমীন। গত বছর টানা ১২ দিন বার্ন ইনস্টিটিউটে মাইলস্টোনের শিশুদের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে নিজেও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হন তিনি। পরে নিজের ট্রমা কাটাতে অন্য বিটে সাংবাদিকতা করেন এবং ভাবতে থাকেন কীভাবে এই শিশুদের সাহায্য করা যায়।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন, রোটারি ক্লাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং ছুটি রিসোর্টের কর্তৃপক্ষ। প্রসঙ্গত, গত বছরের ওই বিমান দুর্ঘটনায় ৩৬ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে ২৮ জন শিক্ষার্থী এবং পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামও ছিলেন।



