টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। শুক্রবার ভোর থেকেই পানির স্তর আবার বাড়তে শুরু করে। এরই মধ্যে উপজেলার শতাধিক গ্রামের প্রায় ৩০ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।

এই দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বাড়ি ছেড়ে বের হওয়া এক পরিবারের নৌকা ডুবে গেছে। এতে ১২ বছরের শিশু হাসনাতু জান্নাতের প্রাণহানি ঘটে। তার দুই ছোট বোন জেরিন মনি (৮) ও শাওরিন মনি (৬) অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ঘটনাটি ঘটে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হারবাং ছড়া সেতুর কাছে।

বরইতলী ইউনিয়নের রসুলাবাদ গ্রামের বাসিন্দা আবদুল মালেক তাঁর স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে নৌকাযোগে নিরাপদ স্থানে যাচ্ছিলেন। হারবাং ছড়া সেতু অতিক্রমের আগেই নৌকাটি উল্টে যায়। মালেক ও তাঁর স্ত্রী সাঁতরে তীরে উঠলেও তিন কন্যাই পানিতে তলিয়ে যায়। স্থানীয়রা তাৎক্ষণিকভাবে বড় দুই মেয়েকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলেও ছোট মেয়ে হাসনাতু জান্নাতের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় বাসিন্দারা ছোট নৌকা নিয়ে অভিযান চালিয়ে দুপুরের দিকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে। কক্সবাজারে ডুবুরি দল না থাকায় চট্টগ্রাম থেকে সহায়তা চাওয়া হয়েছিল।

বন্যার পানি ঘরে ঢুকে পড়ায় রান্নার চুলা ডুবে গেছে। কাকারা ইউনিয়নের লোটনী গ্রামের গৃহবধূ জান্নাতুল ফেরদৌস জানান, ঘরে চাল-তরকারি থাকলেও রান্না করার কোনো জায়গা নেই। মাটির চুলা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বৃহস্পতিবার ভোর থেকে রান্না করতে পারেননি তিনি। শুধু লোটনী নয়, উপজেলার সুরাজপুর-মানিকপুর, লক্ষ্যারচর, কৈয়ারবিল, বরইতলী, হারবাং, ফাঁসিয়াখালী, ডুলাহাজারা ও খুটাখালী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। গতকাল যেখানে হাঁটুপানি ছিল, সেখানে শুক্রবার কোমরপানি দেখা গেছে।

পানি দ্রুত বাড়ায় গবাদিপশু নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকেরা। বরইতলীর ডেইঙ্গাকাটা এলাকার মোহাম্মদ আলী হোসেন জানান, পাঁচটি গরুই তাঁর একমাত্র সম্পদ। তিনি নৌকায় করে গরুগুলো নিরাপদ স্থানে সরিয়ে দিয়েছেন। নিজেরা আশ্রয় নিয়েছেন পাশের একটি বাড়ির ছাদে।

বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ছালেকুজ্জমান বলেন, ইউনিয়নের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত। কিছু মানুষ উঁচু স্থানে আশ্রয় নিলেও অধিকাংশই পানিবন্দী। শুকনা খাবারের জরুরি প্রয়োজন।

চকরিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মকছুদুল হক বলেন, চকরিয়ায় সাধারণত এত বৃষ্টি হয় না। বান্দরবানের থানচি, আলীকদম ও লামায় ভারী বৃষ্টি হলে পাহাড়ি ঢল মাতামুহুরী নদী হয়ে চকরিয়ায় প্রবেশ করে। নদীর বাঁধ উপচে এবং খাল-স্লুইসগেট দিয়ে পানি লোকালয়ে ঢোকে। ২০১৫ ও ২০২৩ সালের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। উজানে বৃষ্টি না কমলে পানি আরও কয়েক দিন থাকতে পারে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার জানান, প্রায় ৩০ হাজার পরিবার পানিবন্দী। বিভিন্ন এলাকায় শুকনা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। মাতামুহুরী নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। নৌকাডুবির পর ফায়ার সার্ভিস উদ্ধার কাজ চালিয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন তৎপর রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।