পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের পতাকার দিকে তাকালে একটি মজার মিল চোখে পড়ে—অধিকাংশ পতাকাতেই লাল, সাদা ও নীল রঙের উপস্থিতি। বর্তমানে বিশ্বে ১৯৫টি স্বীকৃত রাষ্ট্র থাকলেও প্রায় ৩০টি দেশ তাদের জাতীয় পতাকায় এই তিনটি রং ব্যবহার করে। ছোট অঞ্চল ও দ্বীপরাষ্ট্রগুলোকে হিসাবে নিলে এই সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, নিউজিল্যান্ড এবং থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোর পতাকা এই তিন রঙের সংমিশ্রণে তৈরি। কিন্তু কেন এত রঙের ভিড়ে শুধু এই তিনটিই এত জনপ্রিয় হলো?
এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে ইতিহাস, সহজলভ্যতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের জটিল গাঁথুনিতে। ১৭০০ শতকের শেষভাগ থেকে আধুনিক জাতীয় পতাকার ধারণা গড়ে উঠলেও তার আগে থেকেই পতাকা ব্যবহারের চল ছিল। রাজা-বাদশাহ, ব্যবসায়ী ও জলদস্যুরা নিজেদের পরিচয় জানাতে পতাকা ব্যবহার করত। তবে সে সময়ে রং তৈরির উৎস ছিল পুরোপুরি প্রাকৃতিক। ১৮৫৬ সালে উইলিয়াম হেনরি পারকিন নামের ১৮ বছরের এক তরুণ প্রথম কৃত্রিম বেগুনি রং আবিষ্কার করেন। এর আগে সব রং আসত গাছপালা, পোকামাকড় বা খনিজ থেকে। তাই পতাকার রং বাছাইয়ে সহজলভ্যতা, সাশ্রয়ী মূল্য এবং আবহাওয়া সহনশীলতা ছিল প্রধান বিবেচ্য।
লাল রং তৈরি হতো ম্যাডারগাছের মূল থেকে। দামি লাল রং আসত এক বিশেষ পোকার শুকনা গুঁড়া থেকেও। সাদা রংয়ের জন্য কোনো বাড়তি উপাদানের প্রয়োজন হতো না—কাপড় ব্লিচ করলেই সাদা হয়ে যেত। নীল রং পাওয়া যেত 'উড' নামের এক শর্ষে গোত্রীয় উদ্ভিদের পাতা থেকে। এই তিন রং সহজলভ্য ও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় কাপড় রাঙানোর জন্য জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, বেগুনি রং তৈরি হতো এক বিশেষ শামুকের লালা থেকে, যা ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সবুজ, কমলা ও কালো রং সহজে টেকসই করা যেত না, দ্রুত ফ্যাকাশে হয়ে যেত। তাই সস্তা ও টেকসই হওয়ার সুবাদে লাল, সাদা ও নীল রং সবার পছন্দের তালিকায় শীর্ষে চলে আসে। নতুন দেশগুলো পতাকা তৈরি করতে গিয়ে এই পরিচিত তিন রংকেই বেছে নেয়।
সহজলভ্যতার পাশাপাশি শক্তিশালী দেশগুলোর ঐতিহাসিক প্রভাব ও রাজনৈতিক অনুপ্রেরণাও এই তিন রংয়ের বিস্তারে বড় ভূমিকা রেখেছে। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে নেদারল্যান্ডস ছিল সমুদ্র বাণিজ্যে শক্তিশালী। ডাচরা প্রথম তাদের পতাকায় লাল, সাদা ও নীলের তিনটি আড়াআড়ি দাগ ব্যবহার শুরু করে। তাদের দেখে মুগ্ধ হয়ে রাশিয়ার জার পিটার দ্য গ্রেট নিজ দেশের জন্যও একই রঙের পতাকা তৈরি করেন। পরে রাশিয়ার অনুকরণে স্লোভাকিয়া, বুলগেরিয়া ও ক্রোয়েশিয়ার মতো দেশও একই রঙের পতাকা গ্রহণ করে।
ব্রিটেনের ইউনিয়ন জ্যাক পতাকাটিও সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। লাল, সাদা ও নীল রঙের এই পতাকাটি সেন্ট জর্জ, সেন্ট অ্যান্ড্রু ও সেন্ট প্যাট্রিকের ক্রস চিহ্নের সমন্বয়ে তৈরি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মতো দেশগুলোর পতাকার এক কোণায় আজও এই ইউনিয়ন জ্যাক রয়ে গেছে। অন্যদিকে, ফরাসি বিপ্লবের প্রতীক হিসেবে ফ্রান্সের লাল, সাদা ও নীল রঙের পতাকা সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে। স্বাধীনতার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেক দেশ পরে নিজেদের পতাকায় এই তিন রংকে স্থান দেয়।
তবে পৃথিবীর সব অঞ্চলে এই তিন রঙের দাপট সমান নয়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে মুসলিম ঐতিহ্যের চারটি রং—লাল, সাদা, সবুজ ও কালো—বেশি দেখা যায়। সেখানকার বেশির ভাগ ইসলামিক দেশের পতাকায় এই রংগুলোর ব্যবহার রয়েছে। অন্যদিকে, এশিয়ার অনেক দেশের পতাকায় ধর্মীয় বা রাজনৈতিক প্রতীক স্থান পেয়েছে, যার ওপর ইউরোপের কোনো প্রভাব নেই। এমনকি এশিয়ার কিছু পতাকা ইউরোপের দেশগুলোর চেয়ে শত শত বছর পুরোনো। ইতিহাস, সহজলভ্যতা ও শক্তিশালী দেশগুলোর অনুসরণই লাল, সাদা ও নীল রংকে বিশ্বের পতাকায় সবচেয়ে জনপ্রিয় করে তুলেছে।




