মার্কিন ধনকুবের ওয়ারেন বাফেট তার চলতি বছরের বার্ষিক দান থেকে বিল গেটসের প্রতিষ্ঠিত দাতব্য সংস্থা ‘গেটস ফাউন্ডেশন’কে সম্পূর্ণ বাদ দিয়েছেন। মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতার সঙ্গে যৌন অপরাধে দণ্ডিত জেফ্রি এপস্টাইনের সম্পর্কের তথ্য প্রকাশের জেরে এই সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। মঙ্গলবার দেওয়া এক বিবৃতিতে বাফেট জানান, এবার তিনি নিজের পরিবার পরিচালিত চারটি ফাউন্ডেশনে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার দান করবেন, কিন্তু বিবৃতিতে গেটসের কোনো উল্লেখ নেই।

একই বিবৃতিতে বাফেট আরও ঘোষণা দেন, ২০৩৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে তিনি তার বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে কোম্পানির অবশিষ্ট সব শেয়ার—যার বর্তমান বাজারমূল্য ১৪০ বিলিয়ন ডলারের বেশি—দাতব্য সংস্থায় দান করে দিতে চান। আগের পরিকল্পনা ছিল, এই ৯৫ বছর বয়সী বিনিয়োগকারীর মৃত্যুর পর ১০ বছরের মধ্যে তার তিন সন্তান অবশিষ্ট সম্পদ বিতরণ করবেন। বাফেট বলেন, ‘মৃত্যু অনিশ্চিত, তবে আমার অবশিষ্ট শেয়ার কোনো না কোনোভাবে ২০৩৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে চারটি ফাউন্ডেশনে দান করা হবে।’ তাঁর লক্ষ্য, প্রতি বছর যেন সন্তানদের পরিচালিত তিনটি ফাউন্ডেশন ও সুজান থম্পসন বাফেট ফাউন্ডেশনের অনুদান ক্রমশ বৃদ্ধি পায়, বিশেষ করে পরবর্তীটির অনুদান আরও কিছুটা দ্রুত বাড়ে।

গত বছরও বাফেট প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ দান করেছিলেন। এবার তার পরিবারিক ফাউন্ডেশনগুলো আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি অর্থ পাচ্ছে, যা গেটস ফাউন্ডেশনের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের সমতুল্য বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০০৬ সালে নিজের সম্পদ দানের ঘোষণার পর থেকে বাফেট মোট ৬১ বিলিয়ন ডলারের বেশি দান করেছেন, যার সিংহভাগ গেছে গেটস ফাউন্ডেশনে। নিয়মিতভাবে তিনি বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের শেয়ার দান করে আসছিলেন গেটস ফাউন্ডেশন ও সন্তানদের পরিচালিত চারটি ফাউন্ডেশনে। এবার তিনি সুজান থম্পসন বাফেট ফাউন্ডেশনকে প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন ডলার এবং শেরউড ফাউন্ডেশন, হাওয়ার্ড জি. বাফেট ফাউন্ডেশন ও নোভো ফাউন্ডেশনকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার করে শেয়ার দেবেন।

এপস্টাইন কেলেঙ্কারির প্রভাব

বাফেটের এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণ বিল গেটসের সঙ্গে জেফ্রি এপস্টাইনের যোগাযোগ। এপস্টাইন অপ্রাপ্তবয়স্ক কয়েক ডজন মেয়েকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন; ২০১৯ সালের আগস্টে ম্যানহাটনের কারাগারে তাঁর মৃত্যুকে পরে আত্মহত্যা বলে চিহ্নিত করে নিউইয়র্কের মেডিকেল পরীক্ষক। গেটস বরাবরই এপস্টাইনের অপরাধ সম্পর্কে কোনো জ্ঞান থাকার কথা অস্বীকার করেছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অন্যায়ের অভিযোগ ওঠেনি। তিনি বলেছেন, শুধুমাত্র দাতব্য কাজে অর্থ সংগ্রহের আশায় এপস্টাইনের সঙ্গে দেখা করেছিলেন।

তবে গত বছরের শরতে এপস্টাইন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশের পর থেকে বাফেট গেটসের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেননি বলে সিএনবিসিকে জানিয়েছেন। নথিতে দেখা যায়, গেটস এপস্টাইনের সঙ্গে ইমেইলে দাতব্য প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করেছিলেন, বৈঠকের তারিখ ক্যালেন্ডারে ছিল এবং একসঙ্গে তোলা ছবিও রয়েছে। গেটস ফাউন্ডেশন সম্প্রতি একজন কর্মী নিয়োগ দিয়েছে, যিনি ফাউন্ডেশনের অতীত এপস্টাইন-সম্পৃক্ততা পর্যালোচনা করবেন এবং ভবিষ্যতের অংশীদারিত্ব যাচাইয়ের নীতি নির্ধারণ করবেন। এ গ্রীষ্মের মধ্যেই তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে পারবেন পরিচালনা পর্ষদ।

বাফেট সিএনবিসিকে বলেন, এপস্টাইনের মতো প্রতারক এত বেশি ক্ষমতাবান ও ধনী ব্যক্তিকে বোকা বানাতে পেরেছে দেখে তিনি বিস্মিত। তিনি বলেন, ‘সে তাদের দুর্বলতা খুঁজে বের করেছিল। সেটা যৌনতা হতে পারে, ক্ষমতা হতে পারে—যাই হোক। আমি বুঝতে পারি না কেউ কীভাবে এমনটা ঘটাতে পারে।’ বাফেট আরও জানান, তিনি আনন্দিত যে এপস্টাইন কখনো ওমাহায় আসেননি, যেখানে তিনি ছয় দশকের বেশি সময় ধরে বসবাস করছেন।

বাফেট ও গেটসের সম্পর্কের পালাবদল

একসময় এই দুই ধনকুবের ছিলেন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তারা প্রায়ই কথা বলতেন, অনলাইনে ব্রিজ খেলতেন এবং একসঙ্গে ছুটি কাটাতেন। গেটস বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের পরিচালনা পর্ষদে ছিলেন এবং বাফেট গেটস ফাউন্ডেশনের পর্ষদে। তবে ২০২৪ সালে বাফেট জানিয়েছিলেন, মৃত্যুর পর গেটস ফাউন্ডেশনে দান বন্ধ করবেন এবং সন্তানদের হাতে সম্পদ বিতরণের দায়িত্ব ছেড়ে দেবেন। মঙ্গলবারের ঘোষণা সেই পরিকল্পনাই ত্বরান্বিত করল। তিন বছর আগে এক শেয়ারহোল্ডার সভায় গেটসের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা এক ব্যক্তিকে বাফেট থামিয়ে দিয়েছিলেন এবং ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল; এখন সেই অবস্থান বদলেছে।

উল্লেখ্য, ওয়ারেন বাফেট বিশ্বের অন্যতম সেরা বিনিয়োগকারী হিসেবে বিবেচিত। তিনি গেইকো, বিএনএসএফ রেলওয়ে, ডেইরি কুইনের মতো প্রতিষ্ঠান কিনে বার্কশায়ার হ্যাথাওয়েকে গড়ে তুলেছেন। গত জানুয়ারিতে ৬০ বছর পর কোম্পানির প্রধান নির্বাহীর পদ থেকে সরে দাঁড়ালেও চেয়ারম্যান ও সর্ববৃহৎ শেয়ারহোল্ডার হিসেবে রয়েছেন। এখন কোম্পানির সিইও গ্রেগ আবেল।