যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো—যেমন ওপেনএআই, গুগল ও অ্যানথ্রোপিক—বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেল তৈরি করলেও সেগুলোর ব্যবহার ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। টোকেন ও এআই ব্যবহার সংক্রান্ত খরচ বাড়তে থাকায় এখন গ্রাহকমুখী বেশ কিছু কোম্পানি চীনের সস্তা ওপেন-সোর্স মডেলের দিকে ঝুঁকছে। এর একটি উদাহরণ ডোরড্যাশ। প্রতিষ্ঠানটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা অ্যান্ডি ফ্যাং বুধবার এক্স প্ল্যাটফর্মে জানান, তারা ‘ডোরড্যাশ সিএলআই’ নামে একটি পরীক্ষামূলক টুল সীমিত বিটা সংস্করণে চালু করছে, যা ব্যবহারকারীদের এআই এজেন্টের মাধ্যমে বা টার্মিনাল থেকে সরাসরি অর্ডার দিতে সক্ষম করবে। চলতি মাসের শুরুতেই ফ্যাং মন্তব্য করেন, চীনের স্টার্টআপ মুন্শট এআই-এর মডেল ব্যবহার করে ‘ভালো মানের’ সেবা মিলছে এবং তা ‘সস্তাও’ পড়ছে।

ডোরড্যাশ একমাত্র প্রতিষ্ঠান নয় যে চীনের এআই কোম্পানির দিকে নজর দিয়েছে। এআই কোডিং স্টার্টআপ কার্সর তাদের কম্পোজার ২ কোডিং এজেন্ট তৈরিতে মুন্শট এআই-এর কিমি মডেল ব্যবহার করেছে। অপরদিকে স্টার্টআপ লিন্ডি ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অ্যানথ্রোপিকের টুল পুরোপুরি বাদ দিয়ে ডিপসিকের ভি৪ মডেল গ্রহণ করেছে। এয়ারবিএনবি ও সিমেন্সের মতো বড় কোম্পানিও তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম চীনের আলিবাবা ও ডিপসিকের মতো প্রতিষ্ঠানের মডেলে স্থানান্তরের পরীক্ষা চালাচ্ছে, যাতে ক্রমবর্ধমান এআই খরচ কমানো যায়।

কৌশলগত ও আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্রের (সিএসআইএস) ফিউচারস ল্যাবের উপ-পরিচালক ও তথ্য বিশেষজ্ঞ ইয়াসির আতালানের মতে, এই পরিবর্তনের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ কাজ করছে—খরচ, সক্ষমতা এবং ওপেন-সোর্স মডেলের প্রাপ্যতা। ফরচুনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “এখন যা দেখা যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে মার্কিন কোম্পানির সাম্প্রতিক উচ্চ-মানের মডেলগুলো চীনা মডেলের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল। ওপেন-সোর্স মডেলের ধারণা অনেকের জন্যই বেশি আকর্ষণীয়, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের দেশগুলোর জন্য, কারণ তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠানের তথ্য ভাগ করতে চায় না।”

ওপেন-সোর্স এআই নিয়ে উৎসাহ বাড়ায় যেসব কোম্পানি নিজেদের তথ্যের ওপর আরও নিয়ন্ত্রণ চায়, তারা চীনের ওপেন-সোর্স মডেল গ্রহণ করছে। স্থানীয়ভাবে এই মডেল চালালে সংবেদনশীল তথ্য কীভাবে পরিচালিত হবে তার ওপর প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ বাড়ে এবং তৃতীয় পক্ষের কাছে তথ্য পাঠানোর প্রয়োজন কমে। আতালানের ভাষ্যমতে, “আপনার পক্ষে কাছের কোনো মডেল ব্যবহার না করে স্থানীয় মডেল হোস্ট করা ভালো, কারণ এর অর্থ সবকিছু ওই কম্পিউটারেই থাকবে এবং কোনো কোম্পানির কাছে যাবে না। ওপেন-সোর্স মডেল সে ধরনের নিশ্চয়তা দেয়।” তবে এই পদ্ধতির কিছু অসুবিধাও আছে। তিনি উল্লেখ করেন, প্রতিষ্ঠানের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার প্রয়োজন, যার জন্য জিপিইউ, র্যাম ও স্টোরেজ বাবদ ৩০ হাজার ডলারের মতো খরচ হতে পারে।

নিরাপত্তা নিয়ে সংশয়ও রয়েছে। কিছু বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে বলেছেন, সস্তা চীনা মডেল গ্রহণের ক্ষেত্রে সাইবার নিরাপত্তার দুর্বলতা উপেক্ষা করা যাবে না। হরাইজনথ্রি.এআই-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী স্নেহাল অন্তানী ফরচুনকে এক বিবৃতিতে বলেন, স্টার্টআপগুলো যদি এই মডেল গ্রহণ করে, তাহলে তারা “গুরুতর তথ্য সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের ঝুঁকিতে পড়বে, কারণ নিজস্ব কোড ও ব্যবহারকারীর তথ্য বিদেশি নজরদারির সামনে উন্মুক্ত হবে” এবং তারা “মডেলের অখণ্ডতা ও যুক্তিতে গুরুতর দুর্বলতা” এড়িয়ে যেতে পারে। তবে আতালান মনে করেন, এটিকে চীনা মডেলের পূর্ণাঙ্গ স্থানান্তর হিসেবে না দেখাই ভালো। কোম্পানিগুলো ভিন্ন ভিন্ন কাজের জন্য বিকল্প মডেল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে—একটি কাজে ওপেন-সোর্স মডেল আর অন্যটিতে ক্লদ ব্যবহার করা খুবই সম্ভব।

বর্তমানে খুব কম কোম্পানিই প্রকাশ্যে চীনা এআই মডেল ব্যবহারের কথা স্বীকার করলেও গিটহাব ও হাগিং ফেসের মতো প্ল্যাটফর্মে এগুলো সহজলভ্য। ২০২৬ সালের ১৬ মার্চের হাগিং ফেসের এক গবেষণায় দেখা গেছে, চীনা ওপেন-সোর্স মডেল মোট ডাউনলোডের ৪১ শতাংশ দখল করেছে। তবে কম খরচ ঝুঁকি দূর করে না। নিরাপত্তা, তথ্য নিয়ন্ত্রণ এবং উচ্চ-স্টেকের কাজে এই সিস্টেমগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। আতালানের মতে, সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত খরচ ও সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে, মডেলটির উৎস দেশের ওপর নয়। তিনি বলেন, “যদি কোনো মডেল সস্তা ও যথেষ্ট সক্ষম হয় এবং স্থানীয়ভাবে চালানো যায়, তাহলে ব্যবসায়ীরা সেটি ব্যবহার করবে—তা যুক্তরাষ্ট্রের হোক বা চীনের।”