ধানমন্ডিতে পেন বাংলাদেশের কার্যালয়ে গত ১৪ আগস্ট সন্ধ্যায় সাহিত্যিক, অনুবাদক ও ভ্রমণলেখক ফারুক মঈনউদ্দীনের জীবন ও সাহিত্যিক উত্তরাধিকার নিয়ে এক বিশেষ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পেন বাংলাদেশের সভাপতি ও ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক সামসাদ মর্তূজা। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অনুবাদক রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী, কথাসাহিত্যিক পারভেজ হোসেন এবং কবি লোপা মমতাজ।
আয়োজনের শুরুর দিকে ফারুক মঈনউদ্দীনের সাহিত্য নিয়ে নির্ধারিত আলোচনা হলেও সন্ধ্যা যত এগোতে থাকে, ততই তা প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। আলোচকদের বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত হয় পাঠকদের প্রশ্ন এবং লেখকের নিজের নানা স্মৃতিচারণ। উঠে আসে তাঁর ভ্রমণ, অনুবাদ, ছোটগল্প এবং বহু বছর আগের তরুণ বয়সের কবিতা লেখার প্রসঙ্গও। একপর্যায়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা থেকে অনুষ্ঠানটি রূপ নেয় একজন লেখককে ঘিরে এক উন্মুক্ত সাহিত্যিক কথোপকথনে।
কবি লোপা মমতাজের আলোচনার মূল বিষয় ছিল ফারুক মঈনউদ্দীনের ‘সিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগরে’ গ্রন্থটি। তিনি দেখান, ফারুক মঈনউদ্দীনের কাছে ভ্রমণ মানে কেবল স্থান পরিবর্তন বা দৃশ্যের বর্ণনা নয়; নতুন ভূখণ্ডে পৌঁছে তিনি সেই ভূখণ্ডকে প্রকাশের জন্য নতুন শব্দও খুঁজে নেন। ভ্রমণপথে দেখা প্রকৃতি, মানুষ, সংস্কৃতি ও ইতিহাস তাঁর গদ্যে একসাথে স্থান পায়, ফলে পাঠক শুধু দেশটির বাহ্যিক রূপই দেখে না, বরং তার অতীত ও বর্তমানের ভেতরেও ঢুকে পড়ে। তিনি দেখান, পথ চলতে চলতে লেখকের দৃষ্টি প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশাপাশি কর্মরত নারী, মানুষের জীবন ও সংগ্রামের দিকেও নিবদ্ধ ছিল। সমাজকে দেখার এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁর ভ্রমণগদ্যকে সাধারণ পর্যটকের বর্ণনা থেকে পৃথক করে।
অনুবাদক ফারুক মঈনউদ্দীন সম্পর্কে আলোচনা করেন অধ্যাপক রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী। তিনি বিশেষভাবে ক্লিন্টন বি সিলির ‘আ পোয়েট এপার্ট’-এর বাংলা অনুবাদ ‘অনন্য জীবনানন্দ’ প্রসঙ্গে আলোকপাত করেন। একজন বিদেশি গবেষকের গভীর অনুসন্ধানে তৈরি জীবনানন্দ দাশের সাহিত্যিক জীবনকে বাংলা ভাষায় ফিরিয়ে আনার কাজটি জটিল হলেও ফারুক মঈনউদ্দীন তা সাবলীলভাবে সম্পন্ন করেছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। আলোচনার একপর্যায়ে ফারুক মঈনউদ্দীন জানান, প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত বইটির ইতিমধ্যে নয়টি সংস্করণ বেরিয়েছে। অনুবাদের সময় মূল লেখক ক্লিন্টন বি সিলির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে কাজটি এগিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এই বইয়ের জন্য তিনি আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কারও লাভ করেন। এই অনুবাদকে তিনি একটি সাংস্কৃতিক প্রত্যাবর্তন হিসেবে চিহ্নিত করেন।
কথাসাহিত্যিক পারভেজ হোসেন ফারুক মঈনউদ্দীনের গল্পকার সত্তা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি গল্পের বিষয়বস্তুর পাশাপাশি নির্মাণ ও কথকের ভূমিকাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখান। ‘শারীরবৃত্তীয়’ গল্পের প্রসঙ্গে পোশাক কারখানায় কাজ করা এক মা ও তার মেয়ের জীবনসংগ্রামের চিত্র তুলে ধরেন। গল্পটি অবলম্বনে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে বলেও জানানো হয়। তবে বিশেষভাবে আলোচিত হয় ‘কোথায় শরণ’ গল্পটি, যা একটি অসহায় মেয়ের অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের সংকটকে কেন্দ্র করে। পারভেজ হোসেনের পর্যবেক্ষণের মূল জায়গা ছিল এই স্পর্শকাতর বিষয়টি কীভাবে কথক বর্ণনা করছেন এবং পাঠকের কাছে কীভাবে চরিত্রটির অসহায়ত্ব পৌঁছে দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ফারুক মঈনউদ্দীনের গল্প ও অনুবাদে মানুষের জটিল মনস্তত্ত্ব, যন্ত্রণা, স্বপ্ন, ক্ষমতা ও অসহায়ত্বের প্রতি আগ্রহ বারবার ফিরে আসে।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক সামসাদ মর্তূজা ফারুক মঈনউদ্দীনের কর্মজীবন ও সাহিত্যিক জীবনের সমন্বয় তুলে ধরেন। বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে উচ্চপদে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এত বিস্তৃত পরিসরে লেখালেখি অব্যাহত রাখার বিষয়টি তাঁর বক্তব্যে গুরুত্ব পায়। প্রশ্নোত্তর পর্বটি ছিল সন্ধ্যার সবচেয়ে প্রাণবন্ত অংশ। কবি ফরিদ কবিরের প্রশ্ন, 'হেমিংওয়ের নারীরা' লিখেছেন, কখনো কি 'ফারুক মঈনউদ্দীনের নারীরা' লিখবেন? আত্মজীবনী লেখা প্রসঙ্গে লেখক জানান, তিনি ইতিমধ্যে এ কাজ শুরু করেছেন। আর দীর্ঘদিনের বন্ধু সুব্রত শঙ্কর ধর জানান, তরুণ বয়সে ফারুক মঈনউদ্দীন কবিতাও লিখতেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বন্ধুদের সঙ্গে 'সিম্ফনী' নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করতেন। পুরো অনুষ্ঠান শেষে মনে হয়েছে, ফারুক মঈনউদ্দীনের গল্প, অনুবাদ ও ভ্রমণকে আলাদা করে দেখলে তাঁকে সম্পূর্ণ বোঝা যায় না। তাঁর বইয়ের নামগুলোর দিকেও তাকালে এই বিস্তার বোঝা যায়—অনন্য জীবনানন্দ, অতলান্তিকের এপার-ওপার, দূর ভুবনের পাড়ে, মোহিনী মুম্বাই, মার্কেসের জাদু নোবেলের বাস্তবতা ও অন্যান্য, হেমিংওয়ের নারীরা, বিশ্বজোড়া অনন্ত অঙ্গনে। এছাড়া অর্থনীতি ও ব্যাংকিংয়ের মতো বিষয়েও তিনি লিখেছেন। আলোচকদের বিশ্লেষণ, পাঠকের প্রশ্ন, বন্ধুর স্মৃতি ও লেখকের নিজের কথায় ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছিল ফারুক মঈনউদ্দীনের একটি জীবন্ত সাহিত্যিক প্রতিকৃতি।




